চলমান আঞ্চলিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে টানা ৪৮ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে ইরানের লাখ লাখ মানুষ ইন্টারনেট সংযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন রয়েছেন। সাইবার নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা NetBlocks এ তথ্য জানিয়েছে। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, দেশটিতে অনলাইন যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন দেখা দিয়েছে, যা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও তথ্যপ্রবাহে গুরুতর প্রভাব ফেলছে।
নেটব্লকস জানায়, সংঘাত তৃতীয় দিনে গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ইরানের বিভিন্ন অঞ্চলে ইন্টারনেট সংযোগে আংশিক ব্ল্যাকআউট পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। অনেক এলাকায় ব্রডব্যান্ড ও মোবাইল ডেটা সেবা কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মেসেজিং অ্যাপ এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের ওয়েবসাইটে প্রবেশ করতে পারছেন না অধিকাংশ ব্যবহারকারী।
তবে রাজধানী Tehran-এ অবস্থানরত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, এবার পুরোপুরি বা শতভাগ ব্ল্যাকআউট হয়নি। কিছু এলাকায় সীমিত পরিসরে ইন্টারনেট সংযোগ পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে সরকারি দপ্তর ও নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানে নিয়ন্ত্রিত সংযোগ চালু রয়েছে বলে জানা গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ এবং সম্ভাব্য বিক্ষোভ ঠেকাতেই কর্তৃপক্ষ এ ধরনের পদক্ষেপ নিয়ে থাকতে পারে। সংঘাত পরিস্থিতিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দ্রুত সংগঠিত হওয়ার একটি বড় মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। অতীতে দেখা গেছে, রাজনৈতিক অস্থিরতা বা বিক্ষোভের সময় ইরান সরকার ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ জোরদার করেছে।
এর আগে বিভিন্ন সময়ে দেশটিতে ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ রাখার নজির রয়েছে। বিশেষ করে গত জানুয়ারিতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ চলাকালে টানা কয়েক সপ্তাহ দেশজুড়ে ইন্টারনেট সেবা স্থগিত রাখা হয়েছিল। তখন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো তথ্যপ্রবাহে বাধা দেওয়ার সমালোচনা করেছিল।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ইন্টারনেট বিচ্ছিন্নতার ফলে সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। ব্যাংকিং লেনদেন, অনলাইন ব্যবসা, শিক্ষামূলক কার্যক্রম এবং প্রবাসীদের সঙ্গে যোগাযোগ—সব ক্ষেত্রেই বিঘ্ন দেখা দিয়েছে। অনেকেই ভিপিএন ব্যবহার করে সীমিত সংযোগের চেষ্টা করছেন, তবে সেটিও সব জায়গায় কার্যকর হচ্ছে না।
সাইবার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আংশিক ব্ল্যাকআউট পদ্ধতিতে সরকার পুরো নেটওয়ার্ক বন্ধ না করে নির্দিষ্ট প্ল্যাটফর্ম বা আন্তর্জাতিক গেটওয়ে সীমিত করে দেয়। এতে অভ্যন্তরীণ কিছু সেবা সচল থাকলেও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।
আন্তর্জাতিক মহল পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছে। ডিজিটাল অধিকারকর্মীরা মনে করছেন, দীর্ঘ সময় ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন থাকলে মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকট আরও ঘনীভূত হতে পারে। বিশেষ করে চলমান সংঘাতের সময় নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে, যা গুজব ও আতঙ্ক বাড়িয়ে তুলতে পারে।
সরকারিভাবে ইন্টারনেট সীমিত করার বিষয়ে স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা এখনো পাওয়া যায়নি। তবে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে নিরাপত্তাজনিত কারণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
সব মিলিয়ে, ইরানে ৪৮ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে ইন্টারনেট বিচ্ছিন্নতার ঘটনা দেশটির অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। সংঘাতের মধ্যে তথ্যপ্রবাহ সীমিত হওয়ায় নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবন যেমন ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণও কঠিন হয়ে পড়ছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে কত সময় লাগবে—তা এখনো অনিশ্চিত।
কসমিক ডেস্ক