দুষ্টচক্রের ফাঁদে অর্থনীতি, ভঙ্গুর বাস্তবতায় আগামী সরকার The Daily Cosmic Post
ঢাকা | বঙ্গাব্দ
ঢাকা |

দুষ্টচক্রের ফাঁদে অর্থনীতি, ভঙ্গুর বাস্তবতায় আগামী সরকার

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Jan 12, 2026 ইং
দুষ্টচক্রের ফাঁদে অর্থনীতি, ভঙ্গুর বাস্তবতায় আগামী সরকার ছবির ক্যাপশন:
ad728

অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ যত দীর্ঘ হবে, অর্থনীতির ক্ষতি তত বাড়বে—এই সতর্কবার্তা একাধিকবার উচ্চারণ করেছিলেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। তাঁর বক্তব্য ছিল সরল কিন্তু গভীর তাৎপর্যপূর্ণ—একটি দেশের স্থিতিশীলতার ভিত্তি হলো নির্বাচন, আর রাজনীতি ও অর্থনীতি একে অপরের পরিপূরক। স্বল্প মেয়াদি সরকার দীর্ঘায়িত হলে বিনিয়োগ থেমে যায়, কর্মসংস্থান সংকুচিত হয় এবং অর্থনীতির শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে।

এই সতর্কতার সঙ্গে সুর মিলিয়েছিলেন দেশের অধিকাংশ অর্থনীতিবিদ ও গবেষক। কিন্তু বাস্তবতায় তার প্রতিফলন দেখা যায়নি। দেড় বছর পেরিয়ে যাওয়া অন্তর্বর্তী সরকার অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের বদলে যেন এক অদৃশ্য দুষ্টচক্রের ফাঁদে আটকে পড়েছে। অবশেষে ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের তারিখ ঘোষিত হলেও দেশের অর্থনীতি এখন এমন এক অবস্থানে দাঁড়িয়ে, যেখান থেকে ঘুরে দাঁড়ানো আগামী সরকারের জন্য হবে কঠিনতম পরীক্ষা।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, দেশের অর্থনীতি বর্তমানে বিপর্যস্ত। তাঁর মতে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের কোনো পথ নেই। নতুন সরকারের সামনে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বিনিয়োগ বাড়ানো—এই চারটি চ্যালেঞ্জ একসঙ্গে হাজির হবে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ স্থবির, শিল্পকারখানা বন্ধ, এলসি সংকট, শ্রমিক অসন্তোষ—সব মিলিয়ে উৎপাদন ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে। উন্নয়ন ব্যয়ে দেখা গেছে ইতিহাসের সর্বনিম্ন গতি। চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ১১ দশমিক ৭৫ শতাংশ, যা প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

এর পাশাপাশি জনশক্তি রপ্তানিতে স্থবিরতা, ভিসা নিষেধাজ্ঞা এবং বৈদেশিক সম্পর্কের টানাপড়েন রেমিট্যান্স প্রবাহের ভবিষ্যৎকেও অনিশ্চিত করে তুলছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই আর্থসামাজিক বৈষম্যই অতীতে রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্ম দিয়েছিল—যার পরিণতি ছিল শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন।

সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান সতর্ক করে বলেছেন, দেশি-বিদেশি ঋণের বোঝা দ্রুত বাড়ছে। এখন জাতীয় বাজেটের বড় অংশই চলে যাচ্ছে ঋণের সুদ পরিশোধে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের ফাঁদে পড়ার ঝুঁকিতে পড়বে।

ব্যাংক খাতের অবস্থাও উদ্বেগজনক। খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ছয় লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকায়, যা বিতরণ করা ঋণের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি। ব্যাংকগুলোতে তারল্য সংকট তীব্র, উচ্চ সুদহারে ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ অসম্ভব হয়ে উঠেছে। শেয়ারবাজারও বিনিয়োগের উৎস হিসেবে কার্যত নিষ্ক্রিয়।

জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতেও ভারী বোঝা তৈরি হয়েছে। ক্যাপাসিটি চার্জ, ভর্তুকি ও অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতার চাপ রাষ্ট্রীয় অর্থনীতিকে আরও দুর্বল করছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো না গেলে এই সংকট আরও গভীর হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সাবেক অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদের মতে, নতুন সরকারের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি। কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, আস্থা ও আইনশৃঙ্খলার উন্নতি—যা একসঙ্গে অর্জন করা সহজ নয়। অন্যদিকে রাজস্ব আয় বাড়াতে না পারলে সরকারকে ফের ঋণের দুষ্টচক্রেই ঘুরতে হবে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল মজিদ মনে করেন, নির্বাচিত সরকারের ওপর ব্যয়ের চাপ বাড়বে, কিন্তু রাজস্ব সংগ্রহ সেই অনুপাতে বাড়ানো কঠিন হবে। এতে বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরতা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সব মিলিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের উত্তরাধিকার হিসেবে আগামী সরকার পাচ্ছে একটি ভঙ্গুর, চাপে নুয়ে পড়া অর্থনীতি। এই বাস্তবতায় দ্রুত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, নীতিগত দৃঢ়তা ও কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া সংকট থেকে উত্তরণের পথ সহজ নয়। অর্থনীতির এই দুষ্টচক্র ভাঙতে না পারলে ভবিষ্যতের জন্য অশনি সংকেতই থেকে যাবে।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : কসমিক ডেস্ক

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
প্রতিহিংসা নয়, ঐক্যই লক্ষ্য: বিএনপি প্রার্থী কামরুল

প্রতিহিংসা নয়, ঐক্যই লক্ষ্য: বিএনপি প্রার্থী কামরুল