কিছু মৃত্যু কেবল একটি প্রাণের অবসান নয়—সেগুলো একটি জাতির বিবেককে গভীরভাবে নাড়া দেয়। শরীফ ওসমান হাদির মৃত্যু তেমনই এক শূন্যতা সৃষ্টি করেছে, যা আজ শব্দহীন কান্নায় ভরিয়ে দিয়েছে রাজপথ, শিক্ষাঙ্গন এবং অসংখ্য তরুণের হৃদয়।
হাদি ছিলেন সময়ের সন্তান, কিন্তু সাহসে সময়কে অতিক্রম করা এক কণ্ঠস্বর। তিনি ছিলেন স্পষ্টভাষী, আপসহীন এবং সত্য বলায় নির্ভীক। যে কথাগুলো অনেকেই মনে পুষে রাখে, হাদি সেগুলো প্রকাশ করতেন সরাসরি ও দৃঢ়ভাবে। ভয় তাকে থামাতে পারেনি, সুবিধা তাকে নরম করতে পারেনি। তার বিশ্বাস ছিল—সত্য চাপা দিলে রাষ্ট্র দুর্বল হয়, আর ভয়কে মেনে নিলে গণতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ঢাকা–৮ আসনে সংসদ সদস্য প্রার্থীতা ঘোষণা করে যখন তিনি নির্বাচনী মাঠে নামেন, তখন অনেকের কাছে সেটি কেবল একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বলে মনে হলেও বাস্তবে তা ছিল একটি প্রজন্মের প্রত্যাশার প্রতিফলন। সেই পথচলা থেমে যায় সহিংসতার নিষ্ঠুরতায়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু জাতিকে দাঁড় করিয়েছে গভীর শোক এবং আত্মসমালোচনার মুখোমুখি।
হাদির মৃত্যুর খবরে বিশেষ করে ছাত্রসমাজের মধ্যে তীব্র আবেগ ছড়িয়ে পড়ে। রাজধানীতে রাতের বেলায় দেখা যায় বড় জমায়েত, যেখানে প্রকাশ পায় না বলা কষ্ট, ক্ষোভ এবং ভালোবাসা। অনেকের চোখে ছিল অশ্রু, অনেকের কণ্ঠে প্রশ্ন—এভাবে আর কত প্রাণ হারাতে হবে?
তবে এই আবেগের মধ্যেই ঘটে যাওয়া কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা নতুন করে সতর্কতার প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে। শোক যখন নিয়ন্ত্রণ হারায়, তখন তা নিজের উদ্দেশ্যকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে। হাদির জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—আবেগ থাকবে, কিন্তু পথ হবে যুক্তিনির্ভর; প্রতিবাদ থাকবে, কিন্তু তা হবে শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক।
হাদি চাইতেন না তার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে অন্ধ ক্ষোভ তৈরি হোক। তিনি চাইতেন মানুষ সচেতন হোক, প্রশ্ন করুক এবং ভয়কে জয় করুক। তাই আজ সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো এই শোককে শক্তিতে রূপান্তর করা। গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রা থামিয়ে নয়, বরং আরও দৃঢ়ভাবে এগিয়ে নেওয়াই হবে তার প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা।
শান্তিপূর্ণ আন্দোলন, আইনের শাসনের প্রতি আস্থা এবং নৈতিক সাহস—এই তিনটি ছিল হাদির বিশ্বাসের মূল ভিত্তি। তার মৃত্যুর ঘটনায় সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত এখন সময়ের দাবি। অপরাধীরা যেই হোক, তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। ন্যায়বিচার শুধু একটি পরিবারের প্রত্যাশা নয়, এটি জাতির আত্মমর্যাদার প্রশ্ন।
বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের আগে যেকোনো ধরনের সহিংসতা ও অস্থিতিশীলতা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। তাই রাষ্ট্রকে কঠোর কিন্তু আইনসম্মত অবস্থান নিতে হবে, যাতে কোনো কুচক্রী মহল শোকের সুযোগ নিয়ে দেশকে অস্থির করার চেষ্টা করতে না পারে।
এই শোকের মুহূর্তে জাতির সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ঐক্য। মতভেদ থাকবে—এটাই গণতন্ত্রের স্বাভাবিক রূপ। কিন্তু বিভাজন নয়, সহিংসতা নয়। রাষ্ট্র, সমাজ ও মানুষের নিরাপত্তাই সর্বাগ্রে বিবেচ্য।
হাদির মৃত্যুতে আমরা গভীর শোক প্রকাশ করছি এবং তার পরিবারের প্রতি জানাচ্ছি আন্তরিক সমবেদনা। একই সঙ্গে জাতির আবেগের সঙ্গে একাত্ম হয়ে বলা যায়—তিনি ভয় পেতেন না সত্য বলতে। আজ সত্যের পথে এগিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব আমাদের সবার।
কসমিক ডেস্ক