বাংলাদেশ একটি জনবহুল ও কৃষিনির্ভর দেশ। তবে বাস্তবতা হলো—কৃষিজমি ক্রমেই কমছে, উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে এবং দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য নিরাপত্তা একটি বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হচ্ছে। এই বাস্তবতায় দেশের সীমানার বাইরে কৃষি সম্প্রসারণ এখন আর কেবল বিকল্প চিন্তা নয়, বরং কৌশলগত প্রয়োজন হিসেবে সামনে আসছে।
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে আফ্রিকার কিছু দেশ বর্তমানে বিদেশি কৃষি বিনিয়োগের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে। কম জনসংখ্যা, বিস্তৃত জমি এবং বিনিয়োগবান্ধব নীতির কারণে এসব দেশে আন্তর্জাতিক উদ্যোক্তাদের আগ্রহ বাড়ছে। এই তালিকায় অন্যতম সম্ভাবনাময় দেশ হিসেবে উঠে আসছে জাম্বিয়া।
দক্ষিণ-মধ্য আফ্রিকায় অবস্থিত জাম্বিয়ার আয়তন প্রায় সাত লাখ বায়ান্ন হাজার বর্গকিলোমিটার। দেশটির জনসংখ্যা আনুমানিক দুই কোটি এবং রাজধানী লুসাকা। আফ্রিকার অন্যান্য অনেক দেশের তুলনায় জাম্বিয়া রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল ও তুলনামূলকভাবে শান্তিপূর্ণ একটি রাষ্ট্র। বড় ধরনের গৃহযুদ্ধ, দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা বা নিরাপত্তা সংকট দেশটিতে নেই। কৃষির জন্য অনুকূল জলবায়ু এবং পর্যাপ্ত পানিসম্পদ জাম্বিয়াকে একটি সম্ভাবনাময় কৃষিভিত্তিক দেশে পরিণত করেছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—দেশটির বিপুল পরিমাণ কৃষিজমি এখনো পুরোপুরি ব্যবহার হচ্ছে না।
জাম্বিয়া সরকারও কৃষিকে ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান খাত হিসেবে বিবেচনা করছে। খনিজ সম্পদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে তারা কৃষির মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি, রপ্তানি আয় বাড়ানো এবং গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী করার কৌশল গ্রহণ করেছে। এ লক্ষ্যেই বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি কৃষিজমি লিজ, যৌথ উদ্যোগ এবং কর সুবিধার মতো নীতিগত সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশি কৃষি উদ্যোক্তাদের জন্য জাম্বিয়ায় সুযোগের পরিধি বেশ বিস্তীর্ণ। বাংলাদেশে যেখানে জমির মূল্য অত্যন্ত বেশি এবং খণ্ডিত জমি বড় আকারের কৃষিকে বাধাগ্রস্ত করে, সেখানে জাম্বিয়ায় স্বল্প খরচে দীর্ঘমেয়াদে বড় আকারের জমি লিজ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। ধান, ভুট্টা, ডাল, তেলবীজ, সয়াবিন ও গমের মতো শস্য চাষের পাশাপাশি গরু, ছাগল ও ডেইরি ফার্মভিত্তিক লাইভস্টক প্রকল্পও সেখানে বাস্তবসম্মতভাবে গড়ে তোলা সম্ভব। এসব পণ্য শুধু স্থানীয় বাজার নয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বাজারেও রপ্তানিযোগ্য।
বাংলাদেশি উদ্যোক্তারা আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বিভিন্ন পথে জাম্বিয়ায় যেতে পারেন। প্রাথমিক জরিপ ও আলোচনা পর্যায়ে বিজনেস ভিসা, প্রকল্প বাস্তবায়নে ইনভেস্টর বা উদ্যোক্তা পারমিট এবং দক্ষ জনবলের জন্য টেকনিক্যাল পারমিটের ব্যবস্থা রয়েছে। জমি লিজ ও বিনিয়োগ প্রক্রিয়ায় জাম্বিয়ার ভূমি মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয় এবং জাম্বিয়া ডেভেলপমেন্ট এজেন্সি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জাম্বিয়ায় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যৌথ উদ্যোগ বা জয়েন্ট ভেঞ্চার মডেল সবচেয়ে নিরাপদ ও কার্যকর। এতে জমি সাধারণত জাম্বিয়ান সরকার বা স্থানীয় মালিকের অধীনে থাকে, পুঁজি ও প্রযুক্তি আসে বিদেশি উদ্যোক্তার কাছ থেকে এবং শ্রমশক্তি হিসেবে স্থানীয়দের পাশাপাশি দক্ষ বিদেশি কর্মী যুক্ত হয়। এর ফলে জমির মালিকানা ঝুঁকি কমে এবং সামাজিক গ্রহণযোগ্যতাও বৃদ্ধি পায়।
এই ধরনের বিনিয়োগ থেকে বাংলাদেশও বহুমাত্রিক সুফল পেতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার হওয়ার পাশাপাশি প্রবাসী কর্মসংস্থান, কৃষি প্রযুক্তি ও দক্ষতা রপ্তানি, বৈদেশিক মুদ্রা আয় এবং আফ্রিকার সঙ্গে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে জাম্বিয়ার জন্যও এটি একটি লাভজনক অংশীদারিত্ব, যেখানে অব্যবহৃত জমির অর্থনৈতিক ব্যবহার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং কৃষি উৎপাদন ও রপ্তানি বৃদ্ধির পথ খুলে যায়।
নীতিনির্ধারকদের মতে, বাংলাদেশ সরকার, বেসরকারি খাত এবং প্রবাসী উদ্যোক্তাদের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে আফ্রিকায় বাংলাদেশি কৃষি বিনিয়োগ একটি নতুন কৌশলগত অধ্যায়ে পরিণত হতে পারে।
জাম্বিয়া আজ কেবল একটি আফ্রিকান দেশ নয়; এটি বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের জন্য ভবিষ্যৎ কৃষি সম্প্রসারণের এক নীরব সুযোগ। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—যারা সময় থাকতে সিদ্ধান্ত নেয়, তারাই ভবিষ্যৎ নির্মাণ করে। প্রশ্ন এখন একটাই, বাংলাদেশ কি শুধু সীমিত জমির মধ্যেই ভবিষ্যৎ খুঁজবে, নাকি বৈশ্বিক কৃষি শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশের পথে এগোবে?
কসমিক ডেস্ক