কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলায় মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থাকে ঘিরে ভয়াবহ নিয়োগ ও এমপিও জালিয়াতির চিত্র উঠে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, মাদ্রাসা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের (ডিজি) প্রতিনিধির নাম ব্যবহার করে ভুয়া চিঠি ও জাল পদের অনুমোদনপত্র তৈরি করে একের পর এক শিক্ষক-কর্মচারীকে এমপিওভুক্ত করা হচ্ছে। গত পাঁচ মাসেই এই অবৈধ বাণিজ্যের মাধ্যমে অন্তত পাঁচ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র।
স্থানীয় সূত্র ও সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ অনুযায়ী, কয়েকটি মাদ্রাসার সুপার, একটি জালিয়াত চক্র এবং অধিদপ্তরের অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে এই এমপিও বাণিজ্য দীর্ঘদিন ধরে চলছে। ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্ট, কম্পিউটার অপারেটর, সহকারী লাইব্রেরিয়ান এমনকি সহকারী মৌলভী পদের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদেও কোনো বৈধ নিয়োগ প্রক্রিয়া ছাড়াই এমপিওভুক্ত করা হয়েছে। চলতি বছরের আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ের মধ্যে অন্তত ২০টির বেশি পদে এভাবে ভুয়া এমপিও অনুমোদন নেওয়া হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন মাদ্রাসা সুপার জানান, বর্তমানে এমপিও পাওয়ার মূল চাবিকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে ডিজির প্রতিনিধির নামে জাল চিঠি। নিয়মনীতি ও নিয়োগবিধি মানার কোনো প্রয়োজন পড়ছে না—টাকার বিনিময়েই সব কাগজপত্র ‘ম্যানেজ’ করা হচ্ছে।
অনিয়মের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে বড়ঘাটগমীর উদ্দিন মাদ্রাসা। অভিযোগ রয়েছে, মাদ্রাসাটির সুপার আব্দুল আউয়াল তাঁর দুই মেয়েকে অবৈধভাবে বিভিন্ন পদে নিয়োগ দিয়েছেন। সহকারী লাইব্রেরিয়ান পদ বর্তমানে এনটিআরসিএর মাধ্যমে নিয়োগের বিধান থাকলেও তা উপেক্ষা করা হয়েছে। এমনকি প্রতিষ্ঠানে কোনো ল্যাব না থাকলেও ল্যাব অপারেটর ও ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্ট পদে নিয়োগ দেখানো হয়েছে। এক মেয়ের এমপিও আগেই জালিয়াতির কারণে বাতিল হলেও প্রশাসনিক নির্দেশ অমান্য করে তাঁকে আবার ভিন্ন পদে এমপিওভুক্ত করা হয়েছে।
একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে সিরাজউদ্দিন দাখিল মাদ্রাসা ও ডাংরারহাট আজিজিয়া আলিম মাদ্রাসার বিরুদ্ধেও। সিরাজউদ্দিন দাখিল মাদ্রাসায় বর্তমানে কোনো পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা কমিটি নেই। সেখানে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অ্যাডহক কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বিধি অনুযায়ী অ্যাডহক কমিটির নিয়োগ দেওয়ার ক্ষমতা না থাকলেও গত নভেম্বরে তিনটি পদে নতুন করে এমপিও হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, নিয়মিত কমিটির ভুয়া স্বাক্ষর ব্যবহার করে ব্যাকডেট দেখিয়ে এসব নিয়োগ বৈধ করার চেষ্টা করা হয়েছে।
ডাংরারহাট আজিজিয়া আলিম মাদ্রাসায় চারটি পদে নিয়োগের আগেই প্রায় ৭৫ লাখ টাকা ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ তুলেছেন অভিভাবকরা। এ ছাড়া বুড়িরহাট আব্দুস সাত্তার মণ্ডল মাদ্রাসা, কানুরাম সিদ্দিকীয়া মাদ্রাসা ও পান্থাপাড়া মাদ্রাসাসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে একই কায়দায় এমপিও বাণিজ্য চলার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রতিটি পদের জন্য ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে বিজ্ঞানাগার বা কম্পিউটার ল্যাব না থাকলেও ভুয়া ল্যাব দেখিয়ে এবং জাল নথি তৈরি করে এমপিও অনুমোদন নেওয়া হয়েছে।
বড়ঘাট মাদ্রাসার সুপার আব্দুল আউয়ালকে সরেজমিনে ল্যাব দেখাতে বলা হলে তিনি ব্যর্থ হন এবং সাংবাদিকদের প্রশ্ন এড়িয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। সিরাজউদ্দিন মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত সুপার দাবি করেন, নিয়োগ আগেই দেওয়া হয়েছিল। তবে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বলেন, নিয়োগগুলো সম্প্রতি সম্পন্ন হয়েছে।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আল ইমরান বলেন, সিরাজউদ্দিন মাদ্রাসা বর্তমানে অ্যাডহক কমিটির অধীনে চলছে এবং তিনি এর সভাপতি। ‘এই নিয়োগগুলোর বিষয়ে আমি অবগত নই। এমপিও জালিয়াতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে,’—বলেন তিনি।
এমপিও জালিয়াতির এমন বিস্তৃত অভিযোগ সামনে আসায় স্থানীয় শিক্ষাঙ্গনে তীব্র উদ্বেগ ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়বে।