বিদ্যুৎ খাতে মিটার সরবরাহ নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় গড়ে ওঠা একটি প্রভাবশালী চক্র আবার সক্রিয় হয়ে উঠছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সেই চক্রের অন্যতম প্রধান অংশীদার চীনা কোম্পানি হেক্সিং ইলেকট্রিক্যাল কোম্পানি লিমিটেড। শত শত কোটি টাকার মিটার–বাণিজ্যে জড়িত এই প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে অর্থ পাচারসহ নানা অভিযোগ থাকলেও বর্তমানে তারা আবারও মিটার সরবরাহের নিয়ন্ত্রণ নিতে তৎপর।
বিদ্যুৎ বিভাগ গত ১৯ অক্টোবর দেশের ছয়টি বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাকে চিঠি দিয়ে হেক্সিংয়ের সঙ্গে লেনদেন ও ব্যবসায়িক সম্পর্ক স্থাপনে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেয়। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, হেক্সিং ভারত, নেপাল ও কেনিয়াসহ বিভিন্ন দেশে কালোতালিকাভুক্ত এবং প্রতিষ্ঠানটি বিতর্কিত কর্মকাণ্ড ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। ভুয়া বিলের মাধ্যমে অর্থ পাচারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে করা মামলা প্রত্যাহার ও দুদকের অভিযোগ প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া স্থগিত রাখার কথাও বলা হয়।
তবে সতর্কবার্তা থাকা সত্ত্বেও সম্প্রতি একাধিক প্রিপেইড মিটার ক্রয়ের দরপত্রে অংশ নিয়েছে হেক্সিং। খুলনা, বরিশাল ও ফরিদপুর অঞ্চলে বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থা ওজোপাডিকো ১ লাখ ৩৮ হাজার মিটার কেনার দরপত্রের কারিগরি মূল্যায়ন প্রায় শেষ করেছে, যেখানে ছয়টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে হেক্সিংও রয়েছে। দ্বিতীয় দফায় আরও ৫১ হাজার মিটারের দরপত্রেও অংশ নেয় প্রতিষ্ঠানটি।
এই অবস্থায় বিতর্কিত কোম্পানিকে দরপত্রে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। সংগঠনটির জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত আইনি প্রক্রিয়ায় হেক্সিং অব্যাহতি না পায়, ততক্ষণ তারা অপরাধী। তাদের ব্যবসা করার সুযোগ রাখা জনস্বার্থবিরোধী। তিনি আইনানুগ প্রক্রিয়ায় হেক্সিংকে কালোতালিকাভুক্ত করার দাবি জানান।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় একটি চক্র গড়ে মিটার–বাণিজ্য হয়েছে। তদন্তে সব বিষয় উঠে এসেছে। সেই তদন্তের ভিত্তিতেই বিতরণ সংস্থাগুলোকে সতর্ক করা হয়েছে। এর ব্যত্যয় হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ওজোপাডিকোর কর্মকর্তারা জানান, বিদ্যুৎ বিভাগ সতর্ক করলেও হেক্সিংকে আনুষ্ঠানিকভাবে কালোতালিকাভুক্ত করা হয়নি। ফলে দরপত্রে অংশগ্রহণে সরাসরি কোনো আইনি বাধা নেই। এতে বিতরণ সংস্থাগুলোর মধ্যেও বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, জন্মলগ্ন থেকেই ওজোপাডিকোতে মূলত হেক্সিং ও ইনহে ব্র্যান্ডের মিটার স্থাপিত হয়েছে। দরপত্র দলিলে অসংগতি, দুরভিসন্ধিমূলক শর্ত এবং মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় প্রভাব খাটানোর প্রমাণ পাওয়া গেছে। হেক্সিংয়ের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের মামলা হয়েছিল সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে, যা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে প্রত্যাহার করা হয়। বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকে জব্দ থাকা অর্থ যাতে কোনোভাবেই প্রতিষ্ঠানটি ফেরত না পায়, সে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয় প্রতিবেদনে।
গণ-অভ্যুত্থানের পর সরকার পরিবর্তন হলেও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, হেক্সিং ইতিমধ্যে নতুন করে প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহলের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছে। বিদ্যুৎ খাতে আবারও একটি নতুন চক্র গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কসমিক ডেস্ক