রংপুরে চাঞ্চল্যকর একটি হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক প্রধান আসামিকে দীর্ঘ প্রায় ৩০ বছর পর গ্রেপ্তার করেছে র্যাব। র্যাব-১৩-এর একটি বিশেষ অভিযানে রংপুর জেলার বদরগঞ্জ এলাকা থেকে তাকে আটক করা হয়। গ্রেপ্তার হওয়া আসামির নাম শফি উদ্দিন (৬০)। দীর্ঘদিন ধরে আত্মগোপনে থেকে তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে চলছিলেন।
র্যাব সূত্রে জানা যায়, চলমান অপরাধ দমন কার্যক্রমের অংশ হিসেবে সুনির্দিষ্ট তথ্য ও গোপন সংবাদের ভিত্তিতে র্যাব সিপিএসসি, রংপুর-এর একটি চৌকস আভিযানিক দল বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে অভিযান পরিচালনা করে। এই অভিযানটি পরিচালিত হয় রংপুর জেলার বদরগঞ্জ থানাধীন বদরগঞ্জ পৌরসভার ০৩ নম্বর ওয়ার্ড এলাকায়। শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে র্যাব অফিস থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তারের বিষয়টি জানানো হয়।
র্যাব জানায়, বদরগঞ্জ জোনাল অফিস, রংপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর সামনে পাকা সড়কের ওপর চালানো এই অভিযানে তারা সফলভাবে শফি উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। অভিযানের সময় তিনি কোনো ধরনের প্রতিরোধ গড়ে তোলেননি। দীর্ঘদিন ধরে আত্মগোপনে থাকলেও শেষ পর্যন্ত র্যাবের গোয়েন্দা তৎপরতার কাছে ধরা পড়তে হয় তাকে।
গ্রেপ্তারকৃত শফি উদ্দিন রংপুর জেলার মিঠাপুকুর থানার একটি আলোচিত হত্যা মামলার প্রধান আসামি। র্যাবের তথ্য অনুযায়ী, তার বিরুদ্ধে মিঠাপুকুর থানায় বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারায় হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। মামলাটি দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়। সাক্ষ্যপ্রমাণ ও শুনানি শেষে বিজ্ঞ আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেন। তবে রায় ঘোষণার পর থেকেই তিনি পলাতক ছিলেন।
র্যাব সূত্র জানায়, প্রায় তিন দশক ধরে শফি উদ্দিন দেশের বিভিন্ন এলাকায় আত্মগোপনে থেকে পরিচয় গোপন করে বসবাস করছিলেন। কখনো শ্রমিক, কখনো দিনমজুর, আবার কখনো ভিন্ন নাম ও পরিচয়ে বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করে তিনি নিজেকে আড়াল করে রাখতেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক অভিযানের পরও এতদিন তাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।
গ্রেপ্তারকৃত শফি উদ্দিনের পিতার নাম মৃত কফিল উদ্দিন। তার বাড়ি রংপুর জেলার মিঠাপুকুর উপজেলার খামার কুর্শা গ্রামে। স্থানীয়ভাবে তিনি ওই হত্যা মামলার প্রধান আসামি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তবে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যাওয়ায় অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন, তিনি হয়তো আর দেশে নেই বা মৃত্যুবরণ করেছেন। র্যাবের অভিযানের মাধ্যমে তার গ্রেপ্তার সেই ধারণার অবসান ঘটাল।
র্যাব জানায়, গ্রেপ্তারের পর আসামির বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়েছে। পরবর্তীতে তাকে সংশ্লিষ্ট থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে তাকে কারাগারে পাঠানো হতে পারে অথবা উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
র্যাব সূত্র আরও জানায়, হত্যা, ধর্ষণ, ডাকাতি, রাহাজানি, চাঁদাবাজি ও মাদক চোরাচালানসহ সব ধরনের অপরাধ দমনে র্যাব সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দীর্ঘদিন ধরে পলাতক থাকা অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে র্যাবের গোয়েন্দা নজরদারি ও বিশেষ অভিযান আরও জোরদার করা হয়েছে।
র্যাব কর্মকর্তারা বলেন, দীর্ঘ সময় পলাতক থাকলেও অপরাধীরা শেষ পর্যন্ত আইনের হাত থেকে রেহাই পায় না—শফি উদ্দিনের গ্রেপ্তার তারই প্রমাণ। ভবিষ্যতেও অপরাধীদের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে এবং জনগণের জানমাল রক্ষায় র্যাব আপসহীন ভূমিকা পালন করবে।
এই গ্রেপ্তারের ঘটনায় স্থানীয় এলাকাবাসীর মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ কেউ স্বস্তি প্রকাশ করেছেন, আবার কেউ বিস্ময় প্রকাশ করেছেন এত বছর পরও একজন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি এলাকায় আত্মগোপনে থাকতে পেরেছিল বলে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এই সফল অভিযানকে অনেকেই ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।
সব মিলিয়ে, রংপুরে ৩০ বছর পর মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামির গ্রেপ্তার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানের একটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।