অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটেও চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে দেশের অর্থনীতিতে ঘুরে দাঁড়ানোর স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ সাময়িক হিসাব অনুযায়ী, জুলাই–সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে স্থির মূল্যে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভিত্তিতে জিডিপি প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৪.৫০ শতাংশে।
এক বছর আগে, অর্থাৎ ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে এই প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ২.৫৮ শতাংশ। ফলে এক বছরের ব্যবধানে প্রথম প্রান্তিকের প্রবৃদ্ধি কার্যত প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
বিবিএসের তথ্যে দেখা যায়, চলতি মূল্যে হিসাব করলে জিডিপির আকারও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম কোয়ার্টারে চলতি মূল্যে মোট দেশজ উৎপাদনের আকার দাঁড়িয়েছে ১৩ লাখ ৮৫৩ হাজার কোটি টাকা, যেখানে আগের অর্থবছরের একই সময়ে জিডিপির পরিমাণ ছিল ১২ লাখ ৪০১ হাজার কোটি টাকা।
ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে প্রাক্কলিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে স্থির মূল্যে বার্ষিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৩.৭২ শতাংশ। তবে বিবিএস জানিয়েছে, ত্রৈমাসিক ও বার্ষিক হিসাবের মধ্যে পদ্ধতিগত পার্থক্য রয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের চূড়ান্ত জিডিপি নির্ধারণের পর আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বেঞ্চমার্কিং পদ্ধতির মাধ্যমে এই পার্থক্য সমন্বয় করা হবে। ফলে বর্তমান হিসাবগুলো চূড়ান্ত না হলেও অর্থনীতির তাৎক্ষণিক গতিপ্রকৃতি বোঝার জন্য এগুলো গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
আগের অর্থবছরের চতুর্থ প্রান্তিকে (এপ্রিল–জুন ২০২৫) জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৩.৩৫ শতাংশ। পুরো ২০২৪-২৫ অর্থবছরে স্থির মূল্যে গড় প্রবৃদ্ধি দাঁড়ায় ৩.৬৯ শতাংশে।
চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি বাড়ার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে শিল্প খাত। স্থির মূল্যে হিসাব অনুযায়ী, শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬.৯৭ শতাংশ, যেখানে আগের অর্থবছরের একই প্রান্তিকে এই হার ছিল ৩.৫৯ শতাংশ। উৎপাদন, বিদ্যুৎ–গ্যাস–পানি সরবরাহ এবং নির্মাণ খাতের উন্নতিই শিল্প খাতের এই শক্তিশালী পারফরম্যান্সের মূল চালিকা শক্তি।
কৃষি খাতেও ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২.৩০ শতাংশ, যা এক বছর আগে ছিল ঋণাত্মক ০.৬০ শতাংশ। আবহাওয়া পরিস্থিতির উন্নতি, উৎপাদন ব্যয় ব্যবস্থাপনা এবং বাজার ব্যবস্থার কিছুটা স্থিতিশীলতা কৃষি খাতের এই ঘুরে দাঁড়ানোর পেছনে ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সেবা খাতেও প্রবৃদ্ধির গতি বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম কোয়ার্টারে সেবা খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩.৬৭ শতাংশ, যেখানে আগের অর্থবছরের একই সময়ে তা ছিল ২.৯৬ শতাংশ। বাণিজ্য, পরিবহন, যোগাযোগ, আর্থিক সেবা ও অন্যান্য সেবায় চাহিদা ধীরে ধীরে বাড়ার প্রতিফলন হিসেবেই এই উন্নতি দেখা যাচ্ছে।
তবে অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলছেন, এই ইতিবাচক ধারা ধরে রাখতে হলে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা জরুরি। প্রথম প্রান্তিকের এই গতি পুরো অর্থবছরজুড়ে টেকসই হবে কি না, তা নির্ভর করবে নীতি সহায়তা, বৈদেশিক বাণিজ্যের পরিস্থিতি এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ওপর।
কসমিক ডেস্ক