এশিয়ার বৃহত্তম মিঠাপানির জলাভূমি খ্যাত হাকালুকি হাওরে এবার জলচর পাখির সংখ্যা গত বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা ও খ্যাতনামা পাখি বিশেষজ্ঞ ইনাম আল হক শনিবার (৭ মার্চ) কালের কণ্ঠকে জানান, বার্ড ক্লাবের নেতৃত্বে ১২ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল গত ৪ ও ৫ ফেব্রুয়ারি হাকালুকি হাওরের ৪৩টি বিলে পাখিশুমারি পরিচালনা করে।
এই শুমারি বাংলাদেশ বার্ড ক্লাব ও আইইউসিএন-এর সহযোগিতায় অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ, সিলেট সহযোগিতা প্রদান করেছে। শুমারিতে অংশ নেন বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের কর্মকর্তা মো. আবুল কালাম, বার্ড ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক সরওয়ার আলম দীপু, সহ-সভাপতি জেনিফার আজমেরি, এবং সদস্য অণু তারেক।
বার্ড ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক সরওয়ার আলম দীপু জানান, এবারে হাকালুকি হাওরে ৫৩ প্রজাতির মোট ৫৪,৪৮৬টি জলচর পাখি পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ১৮টি স্থানীয় ও ৩৫টি পরিযায়ী প্রজাতির। ২০২৫ সালের শুমারিতে হাওরে ৬০ প্রজাতির ৩৫,২৬৮টি পাখি দেখা গিয়েছিল। হাওরের পানি পর্যাপ্ত থাকায় চিনাউরা, হাওরখালসহ বেশ কয়েকটি বিলের পরিবেশ তুলনামূলকভাবে ভালো ছিল।
এবার হাওরে শিকারিদের অপতৎপরতা কম ছিল। পূর্বের বছরের মতো বিষটোপ ও নিষিদ্ধ জালে আটকে মৃত পাখির ঘটনা এবার ঘটেনি। পাখি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নজরদারির কারণে এমন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এসেছে।
সবচেয়ে বড় আনন্দের খবর হলো হাওরে প্রথমবারের মতো রাজহাঁস দেখা গেছে। ১৯৪টি রাজহাঁস শনাক্ত করা হয়েছে, যা দেশের জন্য বিরল। রাজহাঁস হাওরে সাধারণত ১০–১২ বছরে একবার দেখা যেত। এছাড়া হাওরের সৈকত অঞ্চলে লালপা, গুলিন্দা ও জৌরালি পাখির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যার মধ্যে জৌরালি প্রজাতির সংখ্যা ৩,৫০০-এর বেশি।
ইনাম আল হক হাওরের পাখি ও মাছের উৎপাদন সম্পর্কে বলেছেন, হাওরে মাছের খাবার হিসেবে থাকা ফড়িংসহ পোকামাকড়ের সংখ্যা কমে গেছে। কৃষকরা অবাধে কীটনাশক ব্যবহার করছেন, যা হাওরের বাস্তুতন্ত্রে প্রভাব ফেলছে। হাওরের মাছ ও পাখির প্রজনন রক্ষা করতে অন্তত ২০–৩০টি বিলকে শীতকালীন অভয়াশ্রম হিসেবে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, হাওরের মাছ ও পাখির সংরক্ষণের জন্য সচেতনতা, অভয়াশ্রম বাস্তবায়ন এবং কীটনাশক ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। এর মাধ্যমে হাওরে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে এবং পরিযায়ী ও স্থানীয় পাখির সংখ্যা স্থিতিশীল থাকবে।
মৌলভীবাজারের কুলাউড়া, জুড়ী ও বড়লেখা এবং সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ ও গোলাপগঞ্জ উপজেলায় বিস্তৃত হাকালুকি হাওরের আয়তন প্রায় ২৮,০০০ হেক্টর। ১৯৯৯ সালে সরকার হাওরটিকে ইকোলজিক্যালি ক্রিটিক্যাল এরিয়া ঘোষণা করে। হাওরে ছোট-বড় মিলিয়ে ২৩৮টি বিল রয়েছে।
কুলাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মহিউদ্দিন জানান, হাওরের পরিবেশ যাতে বিনষ্ট না হয় তা নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজন। হাওরের মেদি বিলকে নতুনভাবে অভয়াশ্রম হিসেবে ঘোষণার প্রস্তাবনা অনুমোদন হলে মৎস্য বিভাগ একটি প্রকল্প হাতে নেবে। হাওরের মৎস্যসম্পদ রক্ষায় কীটনাশক ব্যবহারের নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত জরুরি।
এই শুমারি এবং পর্যবেক্ষণ থেকে স্পষ্ট যে, হাকালুকি হাওরের জলচর পাখি ও প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রের রক্ষা দেশের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং জনসচেতনতার মাধ্যমে হাওরের বাস্তুতন্ত্রকে সুরক্ষিত রাখা সম্ভব।
কসমিক ডেস্ক