নতুন বছরের শুরুতেই বিশ্ব রাজনীতিতে দ্রুত পরিবর্তনের আভাস মিলছে। এই পরিবর্তনের অন্যতম কেন্দ্রে রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার আগ্রাসী পররাষ্ট্রনীতি ও সরাসরি হুমকির ভাষা নতুন করে চাপে ফেলেছে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে। ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে শুরু করে রাশিয়ার তেল আমদানি—দুই দিক থেকেই এখন কঠিন পরীক্ষার মুখে ভারত।
প্রথম সতর্কবার্তাটি এসেছে ভেনেজুয়েলা ইস্যুতে। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর সরকারকে শত্রু হিসেবে দেখে আসছে। সাম্প্রতিক সময়ে ভেনেজুয়েলার পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি হস্তক্ষেপ বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। এমনকি ওয়াশিংটনের ঘনিষ্ঠ মিত্র ডেনমার্কও গ্রিনল্যান্ড প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের এই আচরণে একটি নতুন ধরনের সাম্রাজ্যবাদী প্রবণতা স্পষ্ট হচ্ছে। কুয়েত ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক ও চাথাম হাউসের সহযোগী ফেলো বাদের আল-সাইফ ব্লুমবার্গকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অন্য দেশের ওপর বেশি নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব বিস্তার করতে চাইছে।
ভেনেজুয়েলার এই সংকটের সরাসরি অর্থনৈতিক প্রভাব ভারতের ওপর খুব বেশি না পড়লেও বিষয়টি পুরোপুরি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। কারণ, ভারত ও ভেনেজুয়েলার বাণিজ্যের বড় অংশই অপরিশোধিত তেল নির্ভর। নিষেধাজ্ঞার কারণে গত এক বছরে এই আমদানি দুই-তৃতীয়াংশ কমে গিয়ে বর্তমানে দুই দেশের বাণিজ্য নেমে এসেছে প্রায় ৩৪০ মিলিয়ন ডলারে।
কিছু বিশ্লেষকের ধারণা, ভবিষ্যতে রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ বা ওএনজিসির মতো ভারতীয় কোম্পানি ভেনেজুয়েলায় কিছু অর্থনৈতিক সুযোগ পেতে পারে। তবে এসব সম্ভাবনা অনেকটাই যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ পূরণের ওপর নির্ভরশীল। ফলে ভারতকে কার্যত অপেক্ষমাণ তালিকায় থাকতে হচ্ছে।
এর চেয়েও সরাসরি চাপ এসেছে রাশিয়া ইস্যুতে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ভারতকে স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করে বলেছেন, রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানি বন্ধ না করলে ভারতের ওপর আরোপিত শুল্ক আরও বাড়তে পারে। বর্তমানে ভারতীয় পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রে কার্যকর শুল্কের হার দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫০ শতাংশে, যা দিল্লির জন্য বড় অর্থনৈতিক ধাক্কা।
যদিও ডিসেম্বরে রাশিয়া থেকে ভারতের তেল আমদানি তিন বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে, তবুও ট্রাম্প প্রশাসন এতে সন্তুষ্ট নয়। যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য রাশিয়ার সব তেল বিক্রি বন্ধ করে ইউক্রেন যুদ্ধের অর্থনৈতিক জোগান রোধ করা।
এই পরিস্থিতিতে ভারতের সামনে বড় প্রশ্ন—কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষা করা যায়। যুক্তরাষ্ট্র ভারতের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার হওয়ায় এই সম্পর্ক রক্ষা করা অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একই সময়ে ভারতের ভেতরের চিত্র ভিন্ন। বিশ্ব রাজনীতি উত্তপ্ত হলেও দেশটির ভেতরে দ্রুত বাড়ছে সম্পদের পরিমাণ। ব্লুমবার্গের তথ্য অনুযায়ী, মহামারির পর থেকে ভারতের পুঁজিবাজারে অভূতপূর্ব উত্থান ঘটেছে। ২০২৫ সালে প্রতি ছয় সপ্তাহে একজন করে নতুন বিলিয়নপতির জন্ম হয়েছে।
ইউবিএসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে ভারতে বিলিয়নপতির সংখ্যা ছিল প্রায় ১৮৮ জন এবং মিলিয়নপতি ছিল ৯ লাখের বেশি। প্রযুক্তি, সবুজ জ্বালানি ও ওষুধ শিল্প এই সম্পদ বৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে।
এই দ্বিমুখী বাস্তবতায়—একদিকে বৈশ্বিক চাপ, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ সম্পদের উত্থান—ভারতের ভবিষ্যৎ কৌশল নির্ধারিত হবে। বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের আগ্রাসী নীতির সঙ্গে কীভাবে সমন্বয় করে চলবে মোদি সরকার, সেটাই আগামী দিনে ভারতের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গতিপথ ঠিক করে দেবে।
কসমিক ডেস্ক