ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগকে ইতিবাচক ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর জাতীয় নেটওয়ার্ক ক্রেডিট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফোরাম (সিডিএফ)। সংগঠনটির মতে, এ ধরনের ব্যাংক চালু হলে ক্ষুদ্রঋণ খাতের কাঠামো আরও শক্তিশালী হবে এবং এটি বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।
বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে সিডিএফ এ অবস্থান তুলে ধরে। ১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ফোরামের সদস্যসংখ্যা প্রায় ৫০০টি ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান।
সিডিএফ জানায়, ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন মহলে বিভ্রান্তি ও বিতর্ক তৈরি হচ্ছে। কেউ কেউ বলছেন, এই ব্যাংক মুনাফার উদ্দেশ্যে করা হচ্ছে বা এতে বাংলাদেশ ব্যাংক ও মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির (এমআরএ) দ্বৈত নিয়ন্ত্রণ তৈরি হবে। এসব আশঙ্কাকে ভিত্তিহীন উল্লেখ করে সিডিএফ বলেছে, ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠার জন্য অধ্যাদেশ প্রণয়নের প্রস্তাব একটি সময়োপযোগী ও ইতিবাচক উদ্যোগ।
সংগঠনটির মতে, প্রস্তাবিত ব্যাংকের আওতায় সাধারণ মানুষের কাছ থেকে সঞ্চয় সংগ্রহ করা যাবে। ফলে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে উচ্চ সুদে প্রচলিত ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হবে না। এতে তাদের আর্থিক সক্ষমতা বাড়বে এবং গ্রাহকদের জন্য সেবা আরও বিস্তৃত করা সম্ভব হবে।
খসড়া অধ্যাদেশ অনুযায়ী, ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক ঋণ কার্যক্রমের পাশাপাশি বিমা সেবা, প্রবাসী আয় গ্রহণ, দেশি-বিদেশি অনুদান এবং ঋণ গ্রহণ করতে পারবে। একই সঙ্গে কৃষি, কুটির শিল্প ও ক্ষুদ্র উদ্যোগ খাতে ঋণের পরিধি বাড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি হবে।
সিডিএফ বলেছে, প্রস্তাবিত ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক একটি সামাজিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালিত হবে। সামাজিক ব্যবসার মূল দর্শন হলো—ব্যক্তিগত মুনাফার প্রত্যাশা ছাড়াই সামাজিক সমস্যা সমাধানে বিনিয়োগ। তাই এই ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত মুনাফা অর্জনের সুযোগ থাকবে না। বিনিয়োগকারীরা কেবল তাঁদের বিনিয়োগকৃত মূলধনের সমপরিমাণ অর্থই ফেরত পাবেন।
সংগঠনটির দাবি, এই ব্যবস্থায় ক্ষুদ্রঋণ খাতে অনৈতিক চর্চা, অতিরিক্ত মুনাফার লোভ বা সুশাসন সংকট তৈরি হওয়ার যে আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে, তা বাস্তবসম্মত নয়।
সিডিএফ আরও জানায়, ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক চালুর অর্থ এই নয় যে, সব এনজিও বা ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানকে বাধ্যতামূলকভাবে ব্যাংকে রূপান্তর হতে হবে। কোনো প্রতিষ্ঠান চাইলে সম্পূর্ণ এনজিও বা আংশিক কিছু শাখা ব্যাংকে রূপান্তর করতে পারবে। সে ক্ষেত্রে ব্যাংক ও এনজিও অংশ আলাদা কাঠামো ও ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হবে।
নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার বিষয়ে সিডিএফ স্পষ্ট করে বলেছে, এনজিও অংশ এমআরএ-এর অধীনে থাকবে এবং ব্যাংক অংশ বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হবে। এতে দ্বৈত নিয়ন্ত্রণের কোনো সুযোগ থাকবে না।
প্রস্তাবিত ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংকের মালিকানা কাঠামো নিয়েও বিস্তারিত তুলে ধরেছে সিডিএফ। তাদের মতে, ব্যাংকের ৬০ শতাংশ শেয়ার থাকবে দরিদ্র সদস্যদের হাতে এবং বাকি ৪০ শতাংশ থাকবে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে। এর ফলে গরিব সদস্যরা সরাসরি মালিকানা ও ক্ষমতায়নের সুযোগ পাবেন। গ্রামীণ ব্যাংকের মতো এ ব্যবস্থার সফল উদাহরণ বাংলাদেশে আগে থেকেই রয়েছে।
সিডিএফ মনে করে, প্রচলিত মুনাফাভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে সামাজিক উন্নয়নকে মূল লক্ষ্য ধরে গড়ে ওঠা ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক দারিদ্র্য নিরসন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং নতুন উদ্যোগ বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এ কারণেই এই উদ্যোগকে তারা বিশ্বের জন্য বাংলাদেশের আরেকটি অনন্য উদ্ভাবন ও দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছে।