দেশীয় সুতা উৎপাদনকারী শিল্পকে সুরক্ষা দিতে ভারত থেকে ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের কটন সুতা আমদানিতে বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা বাতিলের সুপারিশ করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। তবে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন নিয়ে মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছে দেশের দুই শীর্ষ শিল্পখাত—বস্ত্রকল ও তৈরি পোশাকশিল্প। এক পক্ষ বলছে, বন্ড সুবিধা বাতিল না হলে দেশীয় স্পিনিং শিল্প টিকবে না; অপর পক্ষের মতে, এই সুবিধা প্রত্যাহার হলে দেশের প্রধান রপ্তানিমুখী আরএমজি শিল্প গভীর সংকটে পড়বে।
তৈরি পোশাক খাতের শীর্ষ দুই সংগঠন—বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ) এবং বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ)—মনে করছে, শুল্কমুক্ত সুতা আমদানির বন্ড সুবিধা বাতিল হলে কাঁচামালের খরচ বেড়ে যাবে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
অন্যদিকে, বস্ত্রকল মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) বলছে, শুল্কমুক্ত আমদানির সুযোগ থাকায় দেশীয় সুতা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো টিকে থাকতে পারছে না। সংগঠনটির দাবি, ইতোমধ্যে প্রায় ৫০টি সুতা উৎপাদনকারী কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে আরও প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিটিএমএর গত বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর ও ২৯ ডিসেম্বরের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের সুপারিশ বিবেচনায় নিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডব্লিউটিও-২ শাখা ১০ ও ৩০ কাউন্টের কটন সুতায় বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা অনির্দিষ্টকালের জন্য বাতিলের প্রস্তাব জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) পাঠিয়েছে। যদিও এখনো এনবিআর এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করেনি।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য হলো, দেশীয় স্পিনিং শিল্প বন্ধ হয়ে গেলে ভবিষ্যতে নিট পোশাক খাত পুরোপুরি আমদানিনির্ভর হয়ে পড়বে। এতে দীর্ঘমেয়াদে পোশাকশিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তবে বন্ড সুবিধা বহাল বা প্রত্যাহারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার এনবিআরের।
এদিকে, সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবিতে গতকাল সোমবার বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ যৌথ সংবাদ সম্মেলন করে। সেখানে বিজিএমইএর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সেলিম রহমান বলেন, বিশ্ববাজারের মন্দা, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও জ্বালানি সংকটের মধ্যে সুতা আমদানিতে শুল্ক আরোপ শিল্পের জন্য আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হবে। তিনি বলেন, চলতি অর্থবছরের জুলাই–ডিসেম্বর সময়ে পোশাক রপ্তানি আগের বছরের তুলনায় ২ দশমিক ৬৩ শতাংশ কমেছে এবং শুধু ডিসেম্বর মাসেই রপ্তানি কমেছে ১৪ দশমিক ২৩ শতাংশ।
সেলিম রহমান আরও বলেন, বস্ত্র খাতকে সহায়তা করতে হলে শুল্ক আরোপের পরিবর্তে নগদ সহায়তা, বিশেষ প্রণোদনা, কর ছাড়, স্বল্প সুদে ঋণ এবং গ্যাস–বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার মতো বাস্তবসম্মত উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
অন্যদিকে, বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল দাবি করেন, ভারত থেকে শুল্কমুক্ত সুতা আমদানি বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয় উৎপাদনকারীরা মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে। ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ প্রায় ২৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকার সুতা আমদানি করেছে, যার প্রায় ৯০ শতাংশ এসেছে ভারত থেকে। ভারতের রপ্তানি ভর্তুকির কারণে সেখানে উৎপাদিত সুতা বাংলাদেশে তুলনামূলক কম দামে আসছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সুতার দাম যেখানে কেজিপ্রতি ২ দশমিক ৭০ থেকে ২ দশমিক ৭৫ ডলার, সেখানে আমদানি করা ভারতীয় সুতা পাওয়া যাচ্ছে ২ দশমিক ৫৫ থেকে ২ দশমিক ৬০ ডলারে।
সব মিলিয়ে সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহার ইস্যুতে সরকার যে সিদ্ধান্তই নিক, তা দেশের শিল্প ও রপ্তানি খাতের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কসমিক ডেস্ক