ভোটের মৌসুমে নীরব চাঁদাবাজির মহামারি The Daily Cosmic Post
ঢাকা | বঙ্গাব্দ
ঢাকা |

ভোটের মৌসুমে নীরব চাঁদাবাজির মহামারি

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Jan 19, 2026 ইং
ভোটের মৌসুমে নীরব চাঁদাবাজির মহামারি ছবির ক্যাপশন:
ad728

আনিস (ছদ্মনাম) একজন ব্যবসায়ী। কিন্তু গত এক সপ্তাহ ধরে তিনি অফিসে যাচ্ছেন না। তার ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনটিও বন্ধ। জরুরি প্রয়োজনে সহকর্মীরা গোপনে তার সঙ্গে দেখা করছেন। কোনো মামলার ভয়ে নয়, কোনো পাওনাদারের চাপেও নয়—নির্বাচন উপলক্ষে চাঁদাবাজদের হাত থেকে রক্ষা পেতেই তিনি আত্মগোপনে।

নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পরিচয়ে লোকজন নিয়মিত তার অফিসে আসতে শুরু করে। দাবি একটাই—নির্বাচনের জন্য টাকা লাগবে। চাপ বাড়ে প্রতিদিন। কাকে দেবেন, কতজনকে দেবেন—এই প্রশ্নের উত্তর না পেয়ে শেষ পর্যন্ত তিনি নিজেকেই আড়াল করেছেন।

আনিস একা নন। বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান থেকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী—দেশজুড়ে বেসরকারি খাতের বড় অংশ এখন একই আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। অনেকে নিয়মিত অফিসে যাচ্ছেন না, কেউ মোবাইল ফোন বন্ধ রাখছেন, কেউ বাসা বদল করে অবস্থান গোপন করছেন। এটি প্রকাশ্য চাঁদাবাজি নয়—বরং এক ধরনের নীরব চাঁদাবাজি, যেখানে সরাসরি হুমকি না থাকলেও ইঙ্গিত পরিষ্কার।

এমনিতেই গত দেড় বছর ধরে দেশের অর্থনীতি চরম চাপের মধ্যে রয়েছে। বিনিয়োগ স্থবির, নতুন শিল্প স্থাপনের পরিবেশ নেই। মব সন্ত্রাস, মামলা-হামলা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে বেসরকারি খাত নড়বড়ে। এর মধ্যে নির্বাচনী চাঁদাবাজি যেন মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা।

এই নীরব চাঁদাবাজির বিস্তার শুরু হয় ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগে একশ্রেণির সুযোগসন্ধানী দেশজুড়ে চাঁদাবাজি ও দখল শুরু করে। সরকার বদলালেও চাঁদাবাজির চরিত্র বদলায়নি—শুধু মুখ বদলেছে। বিগত সরকারের সময়কার শূন্যতা দ্রুতই পূরণ হয়েছে নতুন মুখে।

ডিশ-ইন্টারনেট ব্যবসা, পরিবহন, দরপত্র, নির্মাণকাজ, ঝুট ব্যবসা, হাটবাজার, ফুটপাত—কোথাও চাঁদাবাজির বাইরে নয়। শিল্পাঞ্চল, বাণিজ্যিক এলাকা, বাস ও নৌ টার্মিনাল এখন চাঁদাবাজদের প্রধান টার্গেট। তারা সব সময়ই কোনো না কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ে আশ্রয়-প্রশ্রয়ে থাকে।

সাম্প্রতিক সময়ে চাঁদার দাবিতে গুলি, হামলা ও হত্যার ঘটনা আতঙ্ক আরও বাড়িয়েছে। চট্টগ্রামের চান্দনপুরায় সাবেক সংসদ সদস্যের বাসভবনে গুলি, হামজারবাগে নির্মাণাধীন ভবনে শ্রমিকদের ওপর ছুরিকাঘাত, স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে শত শত ভরি স্বর্ণ লুট—এসব ঘটনা এখন আর বিচ্ছিন্ন নয়।

চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কথা বলতেও ভয় পান ব্যবসায়ীরা। কারওয়ান বাজারে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে মানববন্ধনে হামলার ঘটনা সেই বাস্তবতাই তুলে ধরে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নীরব ভূমিকা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, চাঁদাবাজরা এখন সরকারের চেয়েও ক্ষমতাবান। কেউ কেউ নিজেদের ‘জুলাই যোদ্ধা’ পরিচয় দিচ্ছে। কিন্তু প্রকৃত পরিচয় যাচাই করার সাহস নেই কারও। এতে জুলাই আন্দোলনের আদর্শই প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, চাঁদাবাজ, অবৈধ অস্ত্রধারী ও চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিয়েই নির্বাচন আয়োজন করতে গেলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে। নির্বাচনী মৌসুম চাঁদাবাজদের জন্য পরিণত হয়েছে সোনালি সুযোগে।

রাজনৈতিক দলগুলো যদি প্রকাশ্যভাবে চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে অবস্থান না নেয়, প্রশাসন যদি কঠোর না হয়—তাহলে চাঁদাবাজিমুক্ত বাংলাদেশ কেবল স্লোগানই থেকে যাবে। প্রশ্ন রয়ে যায়—আমরা কি পারব এই অরাজকতা থামাতে, নাকি দুর্বৃত্তদের কাছেই জিম্মি হয়ে থাকব?


নিউজটি পোস্ট করেছেন : কসমিক ডেস্ক

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
শীতের তীব্রতা অস্বাভাবিক, জানুয়ারিতে আসছে একাধিক শৈত্যপ্রবাহ

শীতের তীব্রতা অস্বাভাবিক, জানুয়ারিতে আসছে একাধিক শৈত্যপ্রবাহ