রক্তদান শুধু একজন অসুস্থ বা দুর্ঘটনায় আহত মানুষের জীবন বাঁচাতেই সাহায্য করে না, এটি সুস্থ মানুষের জন্যও একটি নিরাপদ চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রক্রিয়া। চিকিৎসকদের মতে, একজন সুস্থ ব্যক্তি রক্ত দেওয়ার পর শরীর অত্যন্ত দ্রুত নিজেকে পুনরুদ্ধারের কাজ শুরু করে এবং প্রথম ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ জৈবিক পরিবর্তন ঘটে।
রক্তদানের সময় শরীর থেকে যে রক্ত নেওয়া হয়, তার তরল অংশ বা প্লাজমা পুনরুদ্ধার সবচেয়ে দ্রুত হয়। সাধারণত ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে শরীর প্লাজমার ঘাটতি পূরণ করতে সক্ষম হয়। এ সময় শরীরের বিভিন্ন টিস্যু থেকে তরল রক্তনালীতে প্রবেশ করে, যা রক্তের স্বাভাবিক পরিমাণ ও রক্তচাপ বজায় রাখতে সহায়তা করে।
এ ছাড়া লিম্ফ্যাটিক সিস্টেমও শরীরে জমা থাকা তরল ও প্রোটিন পুনরায় রক্তে ফিরিয়ে এনে এই পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত করে।
রক্তদানের পর শরীর পানি ধরে রাখার চেষ্টা করে। কিডনি এ সময় অতিরিক্ত পানি সংরক্ষণে ভূমিকা রাখে, আর মস্তিষ্কের সংকেতের কারণে রক্তদাতার তৃষ্ণা বেড়ে যায়। ফলে বেশি পানি পান করার মাধ্যমে শরীর দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারে।
একই সঙ্গে লিভার অ্যালবুমিনসহ প্রয়োজনীয় প্লাজমা প্রোটিন উৎপাদন শুরু করে, যা রক্তের ভারসাম্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
প্লাজমা দ্রুত পূরণ হলেও লোহিত রক্তকণিকা (Red Blood Cells) সম্পূর্ণভাবে আগের মাত্রায় ফিরতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগে। তবে এর মানে এই নয় যে শরীর নিষ্ক্রিয় থাকে। রক্তদানের পরপরই অস্থিমজ্জা (Bone Marrow) নতুন রক্তকণিকা তৈরির কাজ শুরু করে।
শ্বেত রক্তকণিকা ও অণুচক্রিকা তুলনামূলক দ্রুত পুনরুদ্ধার হয় এবং কয়েক দিন থেকে এক সপ্তাহের মধ্যেই স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে। এই কারণেই অধিকাংশ সুস্থ ব্যক্তি রক্তদানের পর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই দৈনন্দিন কাজে ফিরতে পারেন।
কিছু মানুষের ক্ষেত্রে রক্ত দেওয়ার পর সাময়িক ক্লান্তি, দুর্বলতা বা মাথা ঘোরা দেখা দিতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে ভ্যাসোভ্যাগাল রিফ্লেক্স বলা হয়। এ অবস্থায় সাময়িকভাবে হার্ট রেট কিছুটা কমে যেতে পারে এবং মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহও সামান্য হ্রাস পায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রথমবার রক্তদানকারী, কম ওজনের ব্যক্তি, পর্যাপ্ত পানি না খাওয়া, খালি পেটে রক্ত দেওয়া বা পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়ার কারণে এ ধরনের সমস্যা হওয়ার ঝুঁকি কিছুটা বেশি থাকে।
রক্তদানের পর শরীরের স্বাভাবিক পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়াকে সহায়তা করতে কয়েকটি বিষয় অনুসরণ করা প্রয়োজন—
- পর্যাপ্ত পানি ও অন্যান্য তরল পান করুন।
- হালকা ও পুষ্টিকর খাবার খান।
- কয়েক ঘণ্টা বিশ্রাম নিন এবং অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম এড়িয়ে চলুন।
- পরবর্তী কয়েক দিন আয়রনসমৃদ্ধ খাবার যেমন কলিজা, লাল মাংস, ডাল, পালং শাক, ডিম, মাছ ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করুন।
- রক্তদানের দিন ভারী ব্যায়াম, ধূমপান ও অ্যালকোহল থেকে বিরত থাকুন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হৃৎপিণ্ড, কিডনি, লিভার ও অস্থিমজ্জার সমন্বিত কার্যক্রমের মাধ্যমে শরীর খুব দ্রুত রক্তদানের প্রভাব কাটিয়ে ওঠে। তাই নির্ধারিত নিয়ম মেনে সুস্থ অবস্থায় রক্তদান করলে এটি দাতার জন্য নিরাপদ এবং একই সঙ্গে অন্য একজন মানুষের জীবন রক্ষায় অমূল্য ভূমিকা রাখে।
কসমিক ডেস্ক