দেশজুড়ে চলমান শীতের তীব্রতা এখন দুর্যোগপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে। দিন ও রাতের তাপমাত্রার মধ্যে পার্থক্য প্রায় না থাকায় এবং দীর্ঘ সময় ধরে ঘন কুয়াশা বিরাজ করায় মানুষের শীতের অনুভূতি স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি বেড়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, দেশের আবহাওয়ার এই পরিস্থিতি গত ৭৩ বছরের রেকর্ডেও নজিরবিহীন।
এ বিষয়ে গতকাল সোমবার বিকেলে আবহাওয়া অধিদপ্তরের সিনিয়র আবহাওয়াবিদ ড. বজলুর রশিদ বলেন, ২৯ ডিসেম্বর ঢাকায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ১৫ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১৩ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অর্থাৎ ওই দিন রাজধানীতে দিন ও রাতের তাপমাত্রার পার্থক্য ছিল মাত্র ১ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা অত্যন্ত অস্বাভাবিক।
তিনি বলেন, সাধারণত শীতের সময় দিনে তাপমাত্রা কিছুটা বাড়ে এবং রাতে কমে। কিন্তু এবার দিনের বেলায়ও সূর্যের আলো দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে না। দিনের পর দিন গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টির মতো ঘন কুয়াশা পড়ছে। ফলে সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রার পার্থক্য কমে গিয়ে কুলিং প্রক্রিয়া বাড়ছে এবং শীতের তীব্রতা আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ড. বজলুর রশিদ জানান, আবহাওয়া অধিদপ্তরের কাছে থাকা ৭৩ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করেও এমন পরিস্থিতির কোনো নজির পাওয়া যায়নি। তার ভাষায়, “সব মিলিয়ে বর্তমান আবহাওয়া পরিস্থিতি দেশের জন্য দুর্যোগপূর্ণ।”
তিনি আরও বলেন, সাধারণত দুই-তিন দিন ঘন কুয়াশা থাকার পর পরিস্থিতির উন্নতি হয়। কিন্তু এবার দীর্ঘ সময় ধরে একই অবস্থা বিরাজ করছে। ফলে দেশের সর্বত্র মানুষ শীতে থরথর করে কাঁপছে। এমনকি সোমবার দেখা গেছে, দেশের সর্বদক্ষিণের টেকনাফের তুলনায় উত্তরের তেঁতুলিয়ায় তাপমাত্রা বেশি ছিল, যা স্বাভাবিক আবহাওয়ার সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র।
আবহাওয়াবিদদের মতে, দিল্লি থেকে টেকনাফ পর্যন্ত একটি দীর্ঘ কুয়াশার বলয় কয়েক দিন ধরেই বিস্তৃত হয়ে রয়েছে। চলতি শীত মৌসুমে পশ্চিমা লঘুচাপ না থাকা, উল্লেখযোগ্য বৃষ্টির অনুপস্থিতি এবং বাতাসের গতি কম থাকায় কুয়াশা সহজে কাটছে না। ফলে কবে নাগাদ এই পরিস্থিতির উন্নতি হবে, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে পাবনার ঈশ্বরদীতে—৮ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর আগের দিন সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে ৯ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বর্তমানে রাজশাহী বিভাগের আট জেলাসহ কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, যশোর ও দিনাজপুরে শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে।
আবহাওয়াবিদ মো. তরিফুল নেওয়াজ কবীর জানান, তাপমাত্রা কমে যাওয়ায় শৈত্যপ্রবাহের পরিধি কিছুটা বেড়েছে। তবে আজ মঙ্গলবার ও আগামীকাল বুধবার তাপমাত্রা সামান্য বাড়তে পারে। এর পর আবার তা কমার সম্ভাবনা রয়েছে।
আবহাওয়া দপ্তরের সংজ্ঞা অনুযায়ী, সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৮ দশমিক ১ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে মৃদু, ৬ দশমিক ১ থেকে ৮ ডিগ্রি হলে মাঝারি, ৪ দশমিক ১ থেকে ৬ ডিগ্রি হলে তীব্র এবং ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামলে অতি তীব্র শৈত্যপ্রবাহ হিসেবে ধরা হয়।
সংস্থাটি আশঙ্কা করছে, পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে চলতি মাসে তাপমাত্রা ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামতে পারে। তবে ২০১৮ সালের মতো ২ দশমিক ৬ ডিগ্রিতে নামার আশঙ্কা নেই। চলতি মাসে দেশে অন্তত পাঁচ দফায় শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে, যার মধ্যে এক থেকে দুটি তীব্র শৈত্যপ্রবাহ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
কসমিক ডেস্ক