দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতির হার সবচেয়ে বেশি। সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতির দিক থেকে ২০২৫ সালে শীর্ষে ছিল বাংলাদেশ এবং ২০২৬ সালেও এই অবস্থান অপরিবর্তিত থাকবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে জাতিসংঘ।
জাতিসংঘের অর্থনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক বিভাগ সম্প্রতি ‘বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও ২০২৬ সালের সম্ভাবনা’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৯ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ।
জাতিসংঘের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের গড় মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৭ দশমিক ১ শতাংশে নামতে পারে। তবে এই হার কমলেও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশেই মূল্যস্ফীতি সবচেয়ে বেশি থাকবে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে এবং ২০২৬ সালে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ১ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
বাংলাদেশে গত তিন বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশের গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৭৭ শতাংশ। দীর্ঘমেয়াদি এই উচ্চ মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বড় চাপ তৈরি করেছে।
মূল্যস্ফীতির প্রভাব
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মূল্যস্ফীতি এক ধরনের অদৃশ্য করের মতো কাজ করে। পণ্যের দাম বাড়লেও আয় সে অনুপাতে না বাড়লে মানুষের প্রকৃত আয় কমে যায়। এতে সংসার চালাতে গিয়ে মানুষকে খাদ্য, পোশাক, চিকিৎসা ও যাতায়াতসহ নানা খাতে ব্যয় কমাতে হয় অথবা ধারদেনার ওপর নির্ভর করতে হয়।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ
দু-তিন বছর ধরে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি কমানোর চেষ্টা করে। একই সঙ্গে তেল, আলু, পেঁয়াজ, ডিমসহ কয়েকটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে শুল্ক ও কর কমানো হয় এবং আমদানির মাধ্যমে বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে এসব পদক্ষেপের পরও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মূল্যস্ফীতি আবার ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর চিত্র
জাতিসংঘের প্রতিবেদনে দেখা যায়, যেখানে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ওপরে, সেখানে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলোতে মূল্যস্ফীতি তুলনামূলকভাবে অনেক কম। ২০২৫ সালে মালদ্বীপে মূল্যস্ফীতি ছিল ৪ দশমিক ৯ শতাংশ, পাকিস্তানে ৪ শতাংশ এবং ভারতে মাত্র ২ দশমিক ৭ শতাংশ।
এ ছাড়া ভুটান ও নেপালে ২০২৫ সালে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৩ দশমিক ৪ শতাংশ করে এবং শ্রীলঙ্কায় ছিল মাত্র দশমিক ৬ শতাংশ। অথচ ২০২১ সালে শ্রীলঙ্কার মূল্যস্ফীতি ৪৯ শতাংশে এবং ২০২২ সালে পাকিস্তানের মূল্যস্ফীতি ৩০ শতাংশে পৌঁছেছিল। পরবর্তী সময়ে এ দুটি দেশ কঠোর নীতির মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে সক্ষম হয়।
২০২৬ সালের পূর্বাভাস
জাতিসংঘের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে ভারতে মূল্যস্ফীতি হতে পারে ৪ দশমিক ১ শতাংশ, পাকিস্তানে ৭ শতাংশ এবং শ্রীলঙ্কায় ৩ দশমিক ৯ শতাংশ। এসব দেশের তুলনায় বাংলাদেশের সম্ভাব্য ৭ দশমিক ১ শতাংশ মূল্যস্ফীতি তখনও দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ থাকবে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নীতি গ্রহণ না করা হলে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ আরও বাড়বে এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে।