রাজধানী ঢাকায় এক বছরে বেওয়ারিশ লাশের সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। ২০২৫ সালে বিভিন্ন এলাকা থেকে উদ্ধার করা মোট ৬৪৩টি অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ বেওয়ারিশ হিসেবে রাজধানীর বিভিন্ন কবরস্থান ও শ্মশানে দাফন ও দাহ করা হয়েছে। আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে পাওয়া তথ্যে দেখা গেছে, প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৫৪ জন এবং প্রতিদিন গড়ে প্রায় দুইজন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির লাশ দাফন বা সত্কার করা হয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে রায়েরবাজার কবরস্থানে ৪৬১ জন এবং জুরাইন কবরস্থানে ১৭৫ জনের লাশ দাফন করা হয়। এ ছাড়া অন্য ধর্মাবলম্বী সাতজনের লাশ পোস্তগোলা শ্মশানে দাহ করা হয়েছে। এর আগের বছর ২০২৪ সালে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়েছিল ৫৭০টি মরদেহ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বেওয়ারিশ লাশের সংখ্যা বেড়েছে ৭৩টি।
এই পরিস্থিতির সঙ্গে দেশের সামগ্রিক অপরাধ চিত্রও মিলছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৬ মাসে দেশে মোট ৪ হাজার ৭৩২টি হত্যা মামলা রেকর্ড হয়েছে। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন থানায় প্রতি মাসে গড়ে প্রায় আড়াই হাজার অপমৃত্যুর মামলাও নথিভুক্ত হয়েছে।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচন সামনে রেখে সংঘাত ও সহিংসতার ঘটনা বাড়ছে, যার ফলে যত্রতত্র লাশ উদ্ধারের সংখ্যাও বাড়ছে। নারায়ণগঞ্জসহ নদীবেষ্টিত এলাকাগুলোতে সবচেয়ে বেশি মরদেহ উদ্ধার হচ্ছে। গত বছর শুধু নদী থেকেই ৪৪০টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়, যার মধ্যে ১৪১ জনের পরিচয় এখনো শনাক্ত করা যায়নি।
ঢাকা মহানগর পুলিশের গণমাধ্যম শাখার উপকমিশনার মোহাম্মদ তালেবুর রহমান জানান, উদ্ধার করা লাশের পরিচয় শনাক্ত করা না গেলে আইনি প্রক্রিয়া শেষে তা দাফনের জন্য আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামকে হস্তান্তর করা হয়। তিনি বলেন, লাশ সংরক্ষণের নির্দিষ্ট সময়সীমা না থাকায় পরিচয় শনাক্ত না হলে দ্রুত দাফন করা ছাড়া বিকল্প থাকে না।
মানবাধিকার সাংস্কৃতিক সংগঠন (এমএসএফ) বলছে, অজ্ঞাতপরিচয় লাশ উদ্ধারের পর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পরিচয় শনাক্তে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায় না। সংগঠনটির মতে, শুধু লাশ উদ্ধার করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; বরং পরিচয় শনাক্ত করে হত্যার সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব।
পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) কর্মকর্তারা জানান, নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিষয়ে পরিবার অনেক সময় দেরিতে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে, ফলে তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হারিয়ে যায়। এ ছাড়া পচে যাওয়া মরদেহের আঙুলের ছাপ নেওয়া কঠিন হওয়া এবং ছিন্নমূল মানুষের জাতীয় পরিচয়পত্র না থাকাও পরিচয় শনাক্তে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, উন্নত দেশগুলোতে কেন্দ্রীয় ডেটাবেইস থাকার কারণে দ্রুত মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়। কিন্তু বাংলাদেশে এমন সমন্বিত ডেটাবেইসের অভাব তদন্ত কার্যক্রমকে দুর্বল করে তুলছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বেওয়ারিশ লাশের সংখ্যা বৃদ্ধি শুধু মানবিক সংকট নয়, এটি অপরাধ দমন ও ন্যায়বিচার নিশ্চিতের ক্ষেত্রেও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।
কসমিক ডেস্ক