রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের শুরুতে আকাশে উড়ন্ত ড্রোন যুদ্ধের কৌশলে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিল। এখন সেই পরিবর্তনের পরবর্তী ধাপ হিসেবে নীরবে সামনে আসছে চালকবিহীন স্থলযান বা আনম্যানড গ্রাউন্ড ভেহিকল (UGV)। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতের স্থলযুদ্ধের চিত্রই বদলে দিতে পারে।
ইউক্রেন বর্তমানে যুদ্ধক্ষেত্রে বিপজ্জনক অনেক দায়িত্ব মানুষের পরিবর্তে রোবটের মাধ্যমে সম্পন্ন করছে। রসদ ও গোলাবারুদ পরিবহন, আহত সেনাদের উদ্ধার, মাইন স্থাপন, ট্রেঞ্চে অভিযান এমনকি সরাসরি শত্রু অবস্থানে হামলার মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজেও ব্যবহার করা হচ্ছে এসব স্থল রোবট।
ইউক্রেনীয় সেনাদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাশিয়ার ব্যাপক ড্রোন নজরদারি ও হামলার কারণে সামনের সারির সেনাদের দীর্ঘ সময় বাংকারে অবস্থান করতে হয়। ফলে খোলা এলাকায় মানুষের পরিবর্তে রোবট পাঠানো এখন অনেক বেশি নিরাপদ এবং কার্যকর বিকল্প হয়ে উঠেছে।
গত এপ্রিলে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি দাবি করেন, দেশটির বাহিনী আকাশ ও স্থল ড্রোনের সমন্বিত ব্যবহারের মাধ্যমে একটি রুশ অবস্থান দখল করেছে। ওই অভিযানে কোনো ইউক্রেনীয় সেনাকে সরাসরি সম্মুখসমরে অংশ নিতে হয়নি।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, স্থল রোবট প্রযুক্তির উন্নয়নে বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম অগ্রগামী দেশ ইউক্রেন। তবে এই অগ্রগতির সবচেয়ে ব্যতিক্রমী দিক হলো—এ প্রযুক্তির নেতৃত্ব দিচ্ছেন না বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সফটওয়্যার প্রকৌশলীরা; বরং যুদ্ধক্ষেত্রের মেকানিক, ওয়েল্ডার এবং পদাতিক সেনারাই বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে রোবটগুলো উন্নত করছেন।
ইউক্রেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও ইউফোর্স কোম্পানির বোর্ড চেয়ারম্যান ওলেক্সি হনচারুক বলেন, আকাশের ড্রোন প্রযুক্তি মূলত তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের হাত ধরে দ্রুত উন্নত হয়েছে। কিন্তু স্থল রোবটের উন্নয়ন এসেছে সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা থেকে, যেখানে লক্ষ্য ছিল কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজগুলো আরও নিরাপদভাবে সম্পন্ন করা।
রাশিয়ার তুলনায় ইউক্রেনের সেনাসংখ্যা কম হওয়ায় প্রতিটি সেনার জীবন রক্ষা দেশটির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণেই বিভিন্ন ব্রিগেডে শত শত স্থল রোবট মোতায়েন করা হয়েছে। কে-২ ব্রিগেডের একটি রোবট ইউনিটের কমান্ডার মেজর ওলেক্সান্দর জানান, তাদের ইউনিটে ৬০০-এর বেশি স্থল রোবট রয়েছে এবং প্রতিদিন পাঁচ থেকে ছয়টি অভিযান পরিচালিত হয়।
৩৬তম ব্রিগেডের সার্জেন্ট দিমিত্রো ইভানভ জানিয়েছেন, পর্যাপ্ত রোবট পাওয়ার পর তাদের ইউনিটে রসদ পরিবহনের প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ এখন মানুষ ছাড়াই সম্পন্ন হচ্ছে। এতে যেমন সৈন্যদের ঝুঁকি কমেছে, তেমনি সরবরাহ ব্যবস্থাও হয়েছে আরও কার্যকর।
যুদ্ধের আগে অটোমোটিভ ইলেকট্রনিকস কর্মশালা পরিচালনা করতেন ৯৩তম মেকানাইজড ব্রিগেডের ক্যাপ্টেন ওলেক্সান্দর খারকোভেৎস। ২০২৩ সালে বাখমুতের ভয়াবহ যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি একটি রিমোট-নিয়ন্ত্রিত যান তৈরি করেন, যাতে হুক ও মেশিনগান সংযুক্ত ছিল। পরে সেই রোবটের সাহায্যে এমন একটি মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়, যা এক সপ্তাহ ধরেও বিশেষ বাহিনী উদ্ধার করতে পারেনি।
তবে স্থল রোবটের কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। খোলা সমতল এলাকায় এগুলো সহজেই শত্রুর লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে। এছাড়া মানুষের মতো তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়া, বাধা অতিক্রম করা কিংবা জটিল ভূখণ্ডে দ্রুত চলাচলের সক্ষমতাও এখনো সীমিত।
এসব সীমাবদ্ধতা কাটাতে ইউক্রেনের প্রকৌশলীরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক শনাক্তকরণ ব্যবস্থা, বন্ধু-শত্রু চিহ্নিতকরণ প্রযুক্তি এবং ক্ষুদ্র আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সংযোজনের ওপর কাজ করছেন।
ইউক্রেন ইতোমধ্যে ২০২৬ সালের মধ্যে ৫০ হাজার স্থল রোবট উৎপাদনের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অন্যদিকে রাশিয়াও স্থল রোবট ব্যবহার করছে, তবে তুলনামূলকভাবে অনেক কম পরিসরে।
বর্তমানে এসব রোবট শুধু রসদ বহনেই সীমাবদ্ধ নয়। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ইউক্রেনের খারতিয়া কর্পস ইতিহাসের প্রথম পূর্ণাঙ্গ রোবটনির্ভর স্থল হামলা পরিচালনা করে। মেশিনগান, ফ্লেমথ্রোয়ার ও বিস্ফোরক বহনকারী স্থল রোবট আকাশের ড্রোনের সঙ্গে সমন্বয় করে রুশ অবস্থানে আক্রমণ চালায়।
সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত উন্নয়নশীল এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্রে মানুষের ভূমিকা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিতে পারে। ইউক্রেনের অভিজ্ঞতা ইতোমধ্যেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সামরিক বাহিনীর আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
কসমিক ডেস্ক