জুলাই-আগস্ট গণ অভ্যুত্থানের সময় আন্দোলনে অংশ নিয়ে নিখোঁজ হওয়া শহীদদের পরিচয় ফিরিয়ে আনার পথে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। বাংলাদেশ পুলিশের ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট (সিআইডি) ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে আটজন শহীদের পরিচয় শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছে। এই তথ্য গতকাল রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করা হয়।
সিআইডি জানায়, ঢাকার রায়েরবাজার এলাকায় জুলাই গণ অভ্যুত্থানের সময় বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা ১১৪টি মৃতদেহ থেকে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধানে ইতোমধ্যে নয়টি পরিবার তাদের ডিএনএ নমুনা প্রদান করেছে। পরীক্ষার মাধ্যমে এর মধ্যে আটজন শহীদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। শনাক্ত হওয়া প্রত্যেকেই গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছেন বলে সিআইডি নিশ্চিত করেছে।
এই প্রক্রিয়ায় হৃদয়বিদারক একটি ঘটনার কথাও উঠে আসে। এক শহীদের মা দীর্ঘদিন ধরে ছেলের খোঁজে নিয়মিত সিআইডি অফিসে যেতেন এবং রায়েরবাজারে একটি নির্দিষ্ট গাছের নিচে দাঁড়িয়ে সন্তানের জন্য অপেক্ষা করতেন। পরবর্তীতে ডিএনএ পরীক্ষায় সেই গাছের নিচে থাকা কবর থেকেই তার সন্তানের মরদেহ শনাক্ত হয়। বিষয়টি সিআইডি প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. ছিবগাত উল্লাহ প্রধান উপদেষ্টাকে অবহিত করেন।
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস এই কার্যক্রমের জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ডিএনএ শনাক্তকরণ কার্যক্রম প্রমাণ করে—সত্যকে চিরদিন চাপা দেওয়া যায় না। নিহতদের নাম ও পরিচয় ফিরে আসবে, আর তাদের আত্মত্যাগ জাতির ইতিহাসে চিরদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তিনি বলেন, শহীদদের পরিচয় ফিরিয়ে দেওয়া রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব।
তিনি আরও বলেন, তৎকালীন সরকারের সময়ে সংঘটিত বর্বরতা সভ্য বিশ্বের ইতিহাসে বিরল। নিজ দেশের নাগরিকদের হত্যা করে গণকবরে দাফনের ঘটনা কোনো মানবিক রাষ্ট্রে কল্পনাও করা যায় না। ডিএনএ পরীক্ষার এই উদ্যোগ কেবল একটি ফরেনসিক প্রক্রিয়া নয়; এটি নিখোঁজ পরিবারগুলোর জন্য ন্যায়বিচারের পথে এক সাহসী অগ্রযাত্রা এবং আশার আলো।
সিআইডি জুলাই-আগস্ট গণ অভ্যুত্থানের সময় নিখোঁজ হওয়া ব্যক্তিদের স্বজনদের হটলাইন নম্বর ০১৩২০০১৯৯৯৯-এ যোগাযোগ করার আহ্বান জানিয়েছে।
এ পর্যন্ত শনাক্ত হওয়া শহীদরা হলেন—সোহেল রানা (৩৮), রফিকুল ইসলাম (৫২), আসাদুল্লাহ (৩২), মাহিন মিয়া (৩২), ফয়সাল সরকার (২৬), পারভেজ বেপারী (২৩), কাবিল হোসেন (৫৮) এবং রফিকুল ইসলাম (২৯)।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই কার্যক্রমে স্বরাষ্ট্র ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সহযোগিতা প্রদান করছে। কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করতে ফরেনসিক বিজ্ঞানে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিশেষজ্ঞ ড. মরিস টিডবাল বিনজ পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ দিয়েছেন।
বৈঠকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, সিআইডি, চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ এবং জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন।
কসমিক ডেস্ক