খেলার চেয়ে এখন যেন দেশের ক্রিকেটে বেশি আলোচনায় মাঠের বাইরের ঘটনাপ্রবাহ। ব্যাট-বলের লড়াই থেমে গিয়ে জায়গা করে নিয়েছে প্রশাসনিক টানাপোড়েন, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত আর পারস্পরিক দোষারোপ। একদিকে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ঘিরে অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে বোর্ড পরিচালকদের বিতর্কিত মন্তব্যে ক্ষুব্ধ ক্রিকেটাররা। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে মাঠের ক্রিকেট বয়কটের ডাকও এসেছে। তারই পরিণতিতে নির্ধারিত সূচি থাকা সত্ত্বেও বৃহস্পতিবার মাঠে গড়ায়নি বিপিএলের ম্যাচ।
এই অস্থিরতার মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—বাংলাদেশ ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ আসলে কোন দিকে? যে ক্রিকেট একসময় ছিল দেশের মানুষের আবেগ ও গর্বের জায়গা, তা কি আজ ধীরে ধীরে অনিশ্চয়তার ভারে নুয়ে পড়ছে?
অনেকের মনেই ভর করছে এক অস্বস্তিকর তুলনা। একসময় বিশ্ব ক্রিকেটে সম্ভাবনাময় দল হিসেবে পরিচিত কেনিয়ার কথা মনে পড়ছে। বর্তমানে আইসিসির ১০৮টি সদস্য দেশের মধ্যে টেস্ট মর্যাদাপ্রাপ্ত দেশ মাত্র ১২টি। সেই তালিকায় বাংলাদেশের থাকা নিঃসন্দেহে বড় অর্জন। কিন্তু ক্রিকেট রাজনীতির জটিলতায় পড়ে সেই অবস্থান হারালে ফেরার পথ যে কতটা কঠিন—কেনিয়ার উদাহরণই তার বড় প্রমাণ।
১৮৮০ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্রিকেট যাত্রা শুরু করা কেনিয়া ২০০৭ বিশ্বকাপে সেমিফাইনাল খেলে বিশ্বকে চমকে দিয়েছিল। কিন্তু ২০১০ সালে ক্রিকেটারদের ধর্মঘটের পর শুরু হয় তাদের পতন। সংকট সাময়িকভাবে সামাল দেওয়া গেলেও প্রশাসনিক দুর্বলতা ও অভ্যন্তরীণ কোন্দলে দেশটির ক্রিকেট ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়। একসময়কার তারকা অলরাউন্ডার মরিস ওডুম্বের পার্কিং লটে টোল আদায়ের চাকরির খবর বিশ্বজুড়ে আলোচনায় এসেছিল। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি দেখে তাই অনেকেই আশঙ্কা করছেন—ইতিহাস কি আবার নিজেকে পুনরাবৃত্তি করতে চলেছে?
গত দেড় বছরে দেশের ক্রিকেটে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো সেই শঙ্কাকেই উসকে দিচ্ছে। জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক খালেদ মাহমুদ সুজনের ভাষায়, বিশ্বকাপ বয়কট করলে বাংলাদেশ বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার ঝুঁকিও তৈরি হবে।
এই প্রেক্ষাপটে বিসিবির সাবেক পরিচালক সিরাজউদ্দিন মোহাম্মদ আলমগীর মনে করেন, বর্তমান বোর্ডের অদক্ষতাই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। তার মতে, আইসিসির সঙ্গে কূটনৈতিক বোঝাপড়া এবং অভ্যন্তরীণ সংকট সমাধানে প্রয়োজন দক্ষ সংগঠক—যার ঘাটতি এখন স্পষ্ট।
অন্যদিকে বিসিবির আরেক সাবেক পরিচালক সাজ্জাদুল আলম ববি মনে করেন, বিশ্বকাপের মতো ইভেন্টে নিরাপত্তা ইস্যু নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আইসিসিকেই চাপের মুখে রাখা উচিত ছিল। আগেভাগেই নিজেদের অবস্থান কঠোর করে তোলায় পরিস্থিতি জটিল হয়েছে।
অভিজ্ঞ ক্রীড়া সাংবাদিক শামীম চৌধুরীর মতে, বিশ্বকাপ না খেললে আইসিসির লভ্যাংশ পাওয়া নিয়েও জটিলতা তৈরি হতে পারে। ইতোমধ্যে প্রাপ্ত অর্থের বাইরেও বড় অঙ্কের আয় ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে, যা দেশের ক্রিকেটের আর্থিক ভিত্তিকে দুর্বল করবে।
এর মধ্যে যোগ হয়েছে দুদকের অভিযান, বিপিএলে ফিক্সিং বিতর্ক, বোর্ড সভাপতির দ্রুত পরিবর্তন, নির্বাচন ঘিরে সরকারি হস্তক্ষেপের অভিযোগ, ক্লাব ক্রিকেটে অচলাবস্থা এবং নারী ক্রিকেটে যৌন হয়রানির গুরুতর অভিযোগ। প্রতিটি ঘটনাই একেকটি ধাক্কা দিয়েছে দেশের ক্রিকেটের বিশ্বাসযোগ্যতায়।
সবশেষে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ঘিরে নিরাপত্তা অনিশ্চয়তা এবং বোর্ড পরিচালকের বিতর্কিত মন্তব্য ক্রিকেটারদের সঙ্গে বোর্ডের দূরত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলাফল—ক্রিকেট বন্ধ, বিপিএল স্থগিত, আর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।
সব মিলিয়ে দেশের ক্রিকেট আজ এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে। সঠিক সিদ্ধান্ত, দক্ষ নেতৃত্ব ও কূটনৈতিক দূরদর্শিতা না থাকলে কেনিয়ার মতো সম্ভাবনাময় একটি ক্রিকেট শক্তির হারিয়ে যাওয়ার গল্প যে বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বাস্তব হয়ে উঠতে পারে—সে শঙ্কা আর অমূলক মনে হচ্ছে না।
কসমিক ডেস্ক