বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে অপতথ্যের ব্যবহার নতুন নয়। তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে এই প্রবণতা আরও জটিল ও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। ডিপফেক ও চিপফেকের মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি ভুয়া ভিডিও, অডিও ও ছবি এখন নির্বাচনকেন্দ্রিক বিভ্রান্তির বড় হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।
২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটের দিন সকালে গাইবান্ধা-১ আসনের এক স্বতন্ত্র প্রার্থীর একটি ভুয়া ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে তাঁকে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিতে দেখা যায়, যা ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করে। পরে সেটি ডিপফেক বলে প্রমাণিত হয়। এ ঘটনা বাংলাদেশের নির্বাচনে এআই–নির্ভর ভুয়া কনটেন্ট ব্যবহারের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
জার্মান গবেষণা সংস্থা কনরাড অ্যাডেনয়ার ফাউন্ডেশনের ২০২৪ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বের বহু দেশে নির্বাচনের সময় ডিপফেকের ব্যবহার দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে ভোটারদের প্রভাবিত করতে এ ধরনের কৌশল প্রয়োগের নজির রয়েছে।
ফ্যাক্টচেকার ও গবেষকদের মতে, ডিপফেক শুধু ভোটারদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে না, বরং প্রার্থীদের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত করে। বাংলাদেশে ডিজিটাল সাক্ষরতার সীমাবদ্ধতার কারণে ভুয়া কনটেন্টের প্রভাব আরও গভীর হতে পারে। এখন এমন পর্যায়ে প্রযুক্তি পৌঁছেছে যে এআই দিয়ে তৈরি ভিডিও বা অডিও অনেক সময় আসল থেকে আলাদা করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
ডিপফেকের পাশাপাশি ‘চিপফেক’ নামের আরেক ধরনের বিভ্রান্তিকর কনটেন্টও ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এতে উন্নত এআই নয়, বরং সহজ ও সস্তা সফটওয়্যার দিয়ে সত্য তথ্যের বিকৃত ব্যাখ্যা বা ভিন্ন অর্থ তৈরি করা হয়। সংবাদমাধ্যমের ফটোকার্ড নকল করে ভুয়া বক্তব্য ছড়ানো এর একটি সাধারণ উদাহরণ।
ফ্যাক্টচেকার, বিশ্লেষক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, দেশে অন্তত ১০টি কৌশল সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে সত্য ভিডিও বা ছবির সঙ্গে বিভ্রান্তিকর ক্যাপশন জুড়ে দেওয়া, বক্তব্যের অংশবিশেষ কেটে ভিন্ন অর্থ তৈরি করা, সম্পূর্ণ মনগড়া উদ্ধৃতি প্রচার, পুরোনো ছবি বা ভিডিওকে সাম্প্রতিক ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন এবং ভুয়া পরিসংখ্যান ছড়িয়ে দেওয়া।
নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, রাজনৈতিক অপতথ্যের মাত্রাও বাড়ছে। একাধিক রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা ও আলোচিত ব্যক্তিরা ইতিমধ্যে ভুয়া কনটেন্টের শিকার হয়েছেন। তথ্য যাচাইকারী সংস্থাগুলোর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ভিডিওভিত্তিক অপতথ্যই সবচেয়ে বেশি ছড়িয়েছে, যা এআই ব্যবহারের বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, সংঘবদ্ধভাবে পরিচালিত ভুয়া অ্যাকাউন্ট ও পেজের মাধ্যমে একই মিথ্যা তথ্য একযোগে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এ ধরনের ‘বটবাহিনী’ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কাজ করছে বলে ধারণা করা হয়। যদিও অপতথ্য ছড়ানো অ্যাকাউন্ট শনাক্ত করা তুলনামূলক সহজ, তবে এর নেপথ্যের সংগঠকদের চিহ্নিত করা কঠিন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্যমতে, নির্বাচন ঘিরে পক্ষে-বিপক্ষে নানা ধরনের বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট ছড়ানো হচ্ছে। অনলাইনে সংগঠিতভাবে গুজব ও অপতথ্য ছড়ানোর প্রবণতা বাড়ছে, যা সামগ্রিক নির্বাচনী পরিবেশের জন্য উদ্বেগজনক।
এই পরিস্থিতিতে সরকারও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও ভুয়া তথ্য প্রতিরোধে বিশেষ সেল গঠনসহ বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোও ফ্যাক্টচেকিং ও ডিজিটাল ফরেনসিকের মাধ্যমে অপতথ্য মোকাবিলার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে।
তবে বড় সমস্যা হলো—ভুয়া তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং তা অপসারণের আগেই অনেক মানুষ বিশ্বাস করে ফেলে। এমনকি রাজনৈতিক ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরাও কখনো কখনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো গুজবকে সত্য ধরে বক্তব্য দেন। এতে বিভ্রান্তি আরও বাড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিপফেক ও অপতথ্য নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। তাই শুধু নজরদারি নয়, ডিজিটাল সাক্ষরতা বৃদ্ধি, দ্রুত যাচাই ও তথ্যভিত্তিক সচেতনতা তৈরিই হতে পারে এই নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।