ঢাকার সাতটি সরকারি কলেজ নিয়ে ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি’ প্রতিষ্ঠার পথে আরেক ধাপ এগোল সরকার। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে বিশ্ববিদ্যালয়টি গঠনের অধ্যাদেশের খসড়া অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এখন রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষর হলেই নতুন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা।
তবে অনুমোদিত খসড়ায় প্রাথমিক পরিকল্পনার সঙ্গে বড় ধরনের পার্থক্য দেখা গেছে। আন্দোলন, আপত্তি ও আলোচনার পর সরকার বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামোয় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এনে একটি সমঝোতামূলক মডেল দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এতে সাত কলেজের ঐতিহ্য ও বিদ্যমান কাঠামো অনেকটাই অক্ষুণ্ন থাকলেও নতুন বিশ্ববিদ্যালয়টি কার্যত জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো পরিচালিত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
সাত কলেজ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় গঠনের উদ্যোগ শুরু থেকেই বিতর্কের মুখে পড়ে। শিক্ষার্থী, কলেজ শিক্ষক এবং বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের আপত্তির মুখে শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রাথমিক খসড়া থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়। প্রথম খসড়ায় চারটি অনুষদের অধীনে ২৩টি বিষয়ে স্নাতক পর্যায়ে ভর্তি এবং ইন্টিগ্রেটেড ক্যাম্পাস কাঠামোর প্রস্তাব ছিল। এতে কলেজগুলোর প্রশাসনিক ও একাডেমিক স্বাতন্ত্র্য হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়।
প্রাথমিক খসড়ায় নির্দিষ্ট কলেজে নির্দিষ্ট ‘স্কুল’ চালুর পরিকল্পনা ছিল—যেমন ঢাকা কলেজ, ইডেন ও বদরুন্নেসা কলেজে স্কুল অব সায়েন্স, তিতুমীর কলেজে স্কুল অব বিজনেস স্টাডিজ, বাঙলা কলেজে স্কুল অব আর্টস অ্যান্ড হিউম্যানিটিজ। নতুন খসড়ায় এ পরিকল্পনা বাতিল করা হয়েছে। এখন কলেজগুলো যেভাবে বিভাগভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম চালাচ্ছে, তা অপরিবর্তিত থাকবে।
চূড়ান্ত খসড়ায় সাত কলেজকে ‘সংযুক্ত কলেজ’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। কলেজগুলোর অভ্যন্তরীণ প্রশাসন আগের মতোই অধ্যক্ষের অধীনে পরিচালিত হবে। বিশ্ববিদ্যালয় মূলত একাডেমিক সমন্বয়কারী ও মাননিয়ন্ত্রণকারী ভূমিকা পালন করবে। শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের একক সিলেকশন বোর্ডের প্রস্তাবও বাদ দেওয়া হয়েছে, ফলে শিক্ষা ক্যাডারের পদ বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা অনেকটাই কমেছে।
এ ছাড়া প্রথম খসড়ায় প্রস্তাবিত ইন্টারডিসিপ্লিনারি ও হাইব্রিড শিক্ষা পদ্ধতি, ৪০ শতাংশ অনলাইন ক্লাস, নন-মেজর–মেজর বিভাজনসহ বেশ কয়েকটি ধারা চূড়ান্ত খসড়া থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, নতুন অধ্যাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ণাঙ্গ প্রশাসনিক কাঠামো রাখা হয়েছে। রাষ্ট্রপতি আচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। সিনেট মনোনীত প্যানেল থেকে উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হবে। ইউজিসি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা, পরীক্ষা, গবেষণা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম তদারক করবে।
কলেজগুলোতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের পাঠদান ও মূল্যায়ন অভিন্ন সময়সূচি ও কাঠামো অনুযায়ী পরিচালিত হবে। কেন্দ্রীয়ভাবে এমফিল ও পিএইচডি কার্যক্রম, শিক্ষক উন্নয়ন, আবাসিক হল সুবিধা, ছাত্র সংসদ নির্বাচন এবং সহপাঠ্যক্রমিক কার্যক্রম চালুর ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
ঢাকা কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ও সাত কলেজের সাবেক সমন্বয়ক অধ্যাপক আই কে সেলিম উল্লাহ খন্দকার বলেন, নতুন কাঠামোতে সবার দাবি রক্ষার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে অনেক ক্ষেত্রেই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছায়া স্পষ্ট। এতে পুরোপুরি নতুনত্বে কিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও ভবিষ্যতে এই বিশ্ববিদ্যালয় কার্যকরভাবে পরিচালিত হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
কসমিক ডেস্ক