ইতিহাসের নীরব সাক্ষী: মানবিক ফাতেমা
-
নিউজ প্রকাশের তারিখ :
Dec 31, 2025 ইং
ছবির ক্যাপশন: বেগম খালেদা জিয়ার পাশে দীর্ঘদিন ধরে থাকা নীরব সঙ্গী ফাতেমা বেগম।
ইতিহাস সাধারণত রাজা–রানির গল্প লেখে। ক্ষমতার ভাষা, আন্দোলনের স্লোগান, রাষ্ট্রের উত্থান–পতনের রেখাচিত্র। কিন্তু ইতিহাসের আরেকটি স্তর থাকে—নীরব, শব্দহীন, আলোহীন। সেখানে কোনো মাইক থাকে না, ক্যামেরা ঘোরে না। তবু সেই স্তরেই দাঁড়িয়ে থাকেন এমন কিছু মানুষ, যাদের ছাড়া ইতিহাস সম্পূর্ণ হয় না। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তেমনই এক নীরব নাম—ফাতেমা বেগম।
তিনি কোনো রাজনীতিক নন। নেই কোনো পদ, নেই কোনো বক্তব্য। তবু দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের সবচেয়ে আলোচিত রাজনৈতিক নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জীবনের প্রতিটি সংকটময় মুহূর্তে তিনি ছিলেন—একেবারে পাশে। গৃহবন্দিত্বের দীর্ঘ সময়, কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠ, হাসপাতালের নিঃশব্দ রাত কিংবা বিদেশ সফরের নীরব করিডর—সবখানেই ছিলেন এক ছায়ার মতো।
ফাতেমার জীবন শুরু হয়েছিল ভোলার সদর উপজেলার কাচিয়া ইউনিয়নের শাহ-মাদার গ্রামে। নদীঘেরা নিম্নমধ্যবিত্ত এক পরিবারে। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে বড় হওয়ায় ছোট বয়সেই সংসারের ভার এসে পড়ে তার কাঁধে। বাবার মুদি দোকানের সামান্য আয় আর জীবনের কঠিন বাস্তবতার ভেতরেই বড় হন তিনি।
বিয়ে হয় একই ইউনিয়নের কৃষক মো. হারুন লাহাড়ির সঙ্গে। মেঘনা নদীর চরে কৃষিকাজ করে চলত সংসার। দুই সন্তান—মেয়ে জাকিয়া ইসলাম রিয়া ও ছেলে মো. রিফাত—এই ছিল তার পৃথিবী। কিন্তু ২০০৮ সালে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মারা যান স্বামী। তখন ছেলের বয়স মাত্র দুই বছর। এক মুহূর্তে বদলে যায় জীবনের মানচিত্র।
স্বামীর মৃত্যুর পর সন্তানদের নিয়ে বাবার বাড়িতে ফেরেন ফাতেমা। কিন্তু বাস্তবতা ছিল নির্মম। বৃদ্ধ বাবার আয়ে সংসার চালানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। তখনই জীবনের সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত নেন তিনি—সন্তানদের গ্রামে রেখে কাজের সন্ধানে ঢাকায় পাড়ি জমান।
২০০৯ সালে পূর্বপরিচিত একজনের মাধ্যমে তিনি কাজ পান বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বাসভবনে। প্রথমে পরিচয় ছিল গৃহকর্মীর। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই পরিচয়ের সীমা ভেঙে যায়। অসুস্থ নেত্রীর ওষুধ খাওয়ানো, বাথরুমে আনা–নেওয়া, দুর্বল শরীরে হাত ধরে রাখা—এসব দায়িত্ব ধীরে ধীরে দায়িত্বের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে। সম্পর্কের মতো হয়ে যায়।
২০১৪ সালের ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ কর্মসূচির দিন গুলশানের ফিরোজার সামনে বালুভর্তি ট্রাক দিয়ে রাস্তা অবরোধ করা হয়। গাড়িতে উঠেও বেরোতে না পেরে ফিরোজার দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে সাংবাদিকদের সামনে কথা বলছিলেন খালেদা জিয়া। পুলিশের চাপ ও শারীরিক দুর্বলতায় ভারসাম্য হারাতে বসেছিলেন তিনি। ঠিক তখন ক্যামেরার ফ্রেমে ধরা পড়ে এক নীরব দৃশ্য—ফাতেমা বেগম শক্ত করে ধরে রেখেছেন তার হাত। কোনো স্লোগান নেই, কোনো বক্তব্য নেই—শুধু একটি হাত আরেকটি হাতকে ধরে আছে। রাজনীতির উত্তাপের মাঝেও সেই দৃশ্য হয়ে ওঠে মানবিকতার এক স্থির ছবি।
২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি আদালতের রায়ে খালেদা জিয়া কারাগারে গেলে রাজনীতির দৃশ্যপট আরও কঠোর হয়ে ওঠে। নাজিমুদ্দিন রোডের পুরোনো কারাগারে শুরু হয় বন্দিজীবন। আইনজীবীদের আবেদনের পর আদালতের অনুমতিতে ছয় দিন পর কারাগারে প্রবেশ করেন ফাতেমা বেগম। কোনো রাজনৈতিক পরিচয় ছাড়াই তিনি স্বেচ্ছায় কারাবন্দি হন। কারণ, তিনি জানতেন—এই সময়ে একা থাকা মানে ভেঙে পড়া।
২০২১ সালের এপ্রিল মাসে করোনা মহামারির ভয়াল সময়ে খালেদা জিয়া আক্রান্ত হন। টানা ৫৩ দিন হাসপাতালে থাকতে হয় তাকে। যখন মানুষ প্রিয়জনের কাছেও যেতে ভয় পাচ্ছিল, তখন ফাতেমা ছিলেন অবিচল। সেবিকা হয়ে, সাহস হয়ে, ছায়া হয়ে পাশে ছিলেন—নিজের ভয় আর অনিশ্চয়তাকে পেছনে রেখে।
জীবনের শেষ অধ্যায়েও সেই ছায়া সরে যায়নি। লন্ডনে উন্নত চিকিৎসার সময়ও তিনি সঙ্গে ছিলেন। আগেও বহুবার বিদেশ সফরে গেছেন। কোনো আলোচনায় নেই তার নাম, নেই কোনো বক্তব্য। তবু ইতিহাসের পাতায় পাতায় তার ছায়া পড়ে আছে। এভারকেয়ার হাসপাতালে জীবনের শেষ দিন পর্যন্তও খালেদা জিয়ার পাশে ছিলেন তিনি।
একসময় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কটাক্ষ—‘কারাগারেও তাকে ফাতেমাকে লাগবে’—রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। অনিচ্ছাকৃতভাবেই সেই মন্তব্য ফাতেমা বেগমের উপস্থিতির গুরুত্বই প্রকাশ করে দেয়।
আজ প্রশ্ন এসে দাঁড়ায়—খালেদা জিয়ার বিদায়ের পর ইতিহাস কি মনে রাখবে ফাতেমা বেগমকে? নাকি ক্ষমতার আলো নিভে গেলে, সংবাদ শিরোনাম সরে গেলে, তিনি আবার হারিয়ে যাবেন অতল গহ্বরে—যেখান থেকে এসেছিলেন? ইতিহাস সাধারণত নীরব মানুষদের নাম লিখতে চায় না। কিন্তু ফাতেমা বেগম যদি হারিয়েও যান, তবু কিছু ছবি, কিছু মুহূর্ত, কিছু দৃশ্য থেকে যাবে—ফিরোজার দোরগোড়ায় ধরা একটি হাত, কারাগারের অন্ধকারে একাকিত্ব ভাগ করে নেওয়া একটি ছায়া, হাসপাতালের নিঃশব্দ রাতে জেগে থাকা এক নারীর চোখ।
রাষ্ট্র হয়তো তাকে কোনো উপাধি দেবে না, কোনো স্মৃতিফলক গড়বে না। কিন্তু মানবিকতার ইতিহাসে ফাতেমা বেগম চিরকাল থাকবেন সেই নামগুলোর পাশে, যারা কিছু না বলেও সব বলে গেছেন। রাজনীতির কোলাহলের ভিড়ে তিনি এক নীরব নাম—আর সেই নীরবতাই হয়তো তাকে অমর করে রাখবে।
নিউজটি পোস্ট করেছেন :
কসমিক ডেস্ক
কমেন্ট বক্স