ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালিতে অচলাবস্থার প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে। এর সরাসরি প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে, যেখানে পেট্রোলের দাম নতুন রেকর্ড গড়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে প্রতি গ্যালন পেট্রোলের গড় মূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ দশমিক ৩০ ডলার, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ।
American Automobile Association-এর তথ্য অনুযায়ী, মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে গ্যাসোলিনের দাম বেড়েছে প্রায় ২৭ সেন্ট। গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যখন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা চরমে পৌঁছায়, তখন প্রতি গ্যালন পেট্রোলের দাম ছিল ৩ ডলারেরও কম। সেই তুলনায় বর্তমান দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম কারণ হচ্ছে Strait of Hormuz-এ ইরানের অবরোধ এবং যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইরানি বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ আরোপ। এই প্রণালি বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পথ। এখানে অচলাবস্থা তৈরি হলে তেলের সরবরাহ ব্যাহত হয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দাম দ্রুত বাড়তে থাকে।
বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলারের ওপরে উঠে গেছে। গত চার বছরের মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ পর্যায়ের দাম বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সর্বশেষ ২০২২ সালের মাঝামাঝি সময়ে এমন উচ্চমূল্য দেখা গিয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের মধ্যে California-তে জ্বালানির দাম সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। সেখানে প্রতি গ্যালন পেট্রোলের দাম ৬ ডলারেরও বেশি ছাড়িয়েছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়কে আরও চাপের মুখে ফেলেছে।
এই পরিস্থিতির মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট Donald Trump জ্বালানির দাম নিয়ে আশাবাদী বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি দাবি করেন, ইরানের সঙ্গে চলমান অচলাবস্থা শেষ হলেই গ্যাসোলিনের দাম দ্রুত কমে যাবে। তার ভাষায়, “যুদ্ধ শেষ হলেই গ্যাসের দাম হঠাৎ করেই কমে যাবে।”
তবে বাস্তব চিত্র কিছুটা ভিন্ন বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পরও তেলের দাম সঙ্গে সঙ্গে কমেনি। বরং কিছু ক্ষেত্রে তা আরও বেড়েছে। ফলে যুদ্ধ শেষ হলেই দাম কমবে—এমন ধারণা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছেন অনেক বিশেষজ্ঞ।
এদিকে ইরান বরাবরই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট Masoud Pezeshkian সাম্প্রতিক এক বক্তব্যে বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতি ‘না যুদ্ধ, না শান্তি’—এমন এক অনিশ্চিত অবস্থার মধ্যে রয়েছে। তিনি নৌ অবরোধকে একটি দেশের বিরুদ্ধে সামরিক চাপ হিসেবে উল্লেখ করেন এবং এটি বন্ধ না হলে আলোচনা সম্ভব নয় বলে জানান।
অন্যদিকে ট্রাম্প দাবি করেছেন, সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে ইরান দুর্বল অবস্থায় রয়েছে এবং তারা চুক্তির জন্য আগ্রহী। তবে তেহরান স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, অবরোধ প্রত্যাহার না হলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো সরাসরি আলোচনা হবে না।
সব মিলিয়ে, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি জ্বালানি বাজারকে অত্যন্ত অস্থির করে তুলেছে। এর প্রভাব শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই নয়, বিশ্বব্যাপী অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনে পড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে জ্বালানির দাম আরও বাড়তে পারে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করবে।
কসমিক ডেস্ক