রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দেশের শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছিল। প্রত্যাশা ছিল, দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও দুর্নীতির অবসান ঘটিয়ে বাজারে শৃঙ্খলা ও গতিশীলতা ফিরবে। তবে বছর শেষে এসে দেখা যাচ্ছে, সেই প্রত্যাশার বাস্তবায়ন হয়নি। ব্যাংক ও আর্থিক খাতে কিছু সংস্কারের প্রভাব থাকলেও পুঁজিবাজারে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি।
২০২৫ সালের প্রথম কার্যদিবসেই শেয়ারবাজারে লেনদেন শুরু হয় দরপতনের মাধ্যমে। সে দিন লেনদেনের পরিমাণ ছিল মাত্র কয়েকশ কোটি টাকা। বছরজুড়ে বাজার কখনো থেমে থেমে, কখনো টানা পতনের মধ্য দিয়েই চলেছে। অধিকাংশ বিনিয়োগকারী মুনাফা তো পানইনি, বরং মূলধন হারিয়েছেন। হতাশার বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে—পুরো বছরে একটি কোম্পানিও শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়নি; আইপিও কার্যক্রম কার্যত বন্ধ ছিল।
বাজারে সাময়িক স্থিতিশীলতা ফেরাতে সরকার রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ সংস্থা আইসিবিকে নতুন করে এক হাজার কোটি টাকা ঋণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, বছরের শেষদিকে সূচকের সামান্য ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার পেছনে আইসিবির সক্রিয় ভূমিকাই প্রধান কারণ।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন বলেন, রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন ও নির্বাচন ঘিরে নতুন পরিবেশ তৈরি হলে শেয়ারবাজারেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাঁর মতে, জাতীয় নির্বাচন শেষে একটি স্থিতিশীল সরকার দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগবান্ধব নীতি গ্রহণ করলে বাজার ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
তবে বছরের শেষ প্রান্তে বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে আসে পাঁচটি ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার শূন্য ঘোষণা। ঋণ কেলেঙ্কারির পর এসব ব্যাংক একীভূত করার প্রক্রিয়ায় শেয়ারহোল্ডারদের বিনিয়োগ কার্যত বাতিল হয়ে যায়। এতে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা সম্পূর্ণ মূলধন হারান। পাশাপাশি আরও কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়নের ঘোষণায় বাজারে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
অতীতে শেয়ারবাজারে অনিয়মের ঘটনায় বড় অঙ্কের জরিমানা ঘোষণা করা হলেও বাস্তবে তা আদায় হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে দায়ীদের কার্যকর শাস্তি হয়নি। বর্তমান বিএসইসির নেতৃত্ব আইন সংস্কারের মাধ্যমে অনিয়ম বন্ধের যে আশ্বাস দিয়েছিল, তার বড় অংশ বাস্তবায়িত হয়নি বলেই মনে করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা। এর ফলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা আরও দুর্বল হয়েছে।
বছরের বিভিন্ন সময়ে বিএসইসির চেয়ারম্যানের পদত্যাগ দাবিতে বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ বিক্ষোভে নামে। এমনকি কমিশনের ভেতরেও নেতৃত্ব ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, শেয়ারবাজারের বর্তমান সংকট কোনো একক সমস্যার ফল নয়। সার্বিক ব্যবস্থাপনার প্রতি আস্থাহীনতাই মূল কারণ। তাঁর মতে, জাতীয় নির্বাচন ঘিরে সাধারণত বাজারে যে প্রাণচাঞ্চল্য দেখা যায়, এবার তা একেবারেই অনুপস্থিত। পাঁচটি ব্যাংকের একীভূতকরণে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের যে ক্ষতি হয়েছে, তা পুনর্বিবেচনার দাবি জানান তিনি।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, কার্যকর সংস্কার, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে নতুন বছরেও শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানো কঠিন হবে।
কসমিক ডেস্ক