বঙ্গোপসাগরে হঠাৎ করে জলদস্যুদের দৌরাত্ম্য বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশ কোস্টগার্ড নাফ নদী থেকে শুরু করে গভীর সমুদ্র পর্যন্ত টহল জোরদার করেছে। একই সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি কার্যক্রম চালু করা হয়েছে, যার মাধ্যমে জলদস্যুদের কর্মকাণ্ড দ্রুত শনাক্ত ও প্রতিহত করা সম্ভব হচ্ছে।
গত ২৫ ফেব্রুয়ারি কুতুবদিয়ার একজন জেলে শাহাদাত জলদস্যুর গুলিতে নিহত হওয়ার পর সমুদ্রের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়। জলদস্যুরা মাছধরা ট্রলারে হামলা চালিয়ে জেলেদের নির্যাতন, জিম্মি এবং মূল্যবান যন্ত্রপাতি লুটে নিচ্ছে।
জেলেদের অভিযোগ অনুযায়ী, ‘উম্মে হাবীবা’ ট্রলারের মাঝি রশিদ উল্লাহ বলেন, “১২ দিনের মাছ ধরা শেষে ফেরার পথে গভীর সমুদ্রে আমরা জলদস্যুর কবলে পড়ি। মোবাইল নেটওয়ার্ক না থাকার কারণে তাৎক্ষণিকভাবে সাহায্য চাইতে পারিনি এবং দস্যুরা আমাদের মারধর করে মাছসহ যন্ত্রপাতি লুটে নেয়।”
একইভাবে ‘এফবি মায়ের দোয়া’ ট্রলারের মাঝি সাব্বির আহমদ বলেন, “চট্টগ্রামের বাঁশখালী, কুতুবদিয়া, মহেশখালী ও সোনাদিয়া এলাকায় দস্যুদের কার্যক্রম আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। তারা ছদ্মবেশে এসে অস্ত্রের মুখে জেলেদের নিস্প্রাণ করে সর্বস্ব লুটে নিচ্ছে।”
জলদস্যু দমনে কোস্টগার্ডের উদ্যোগের অংশ হিসেবে, শাহপরী স্টেশন কমান্ডার লে. মো. শাহাদাত হোসেন নাঈম জানান, সমুদ্র এলাকায় ২৪ ঘণ্টা টহল চালানো হচ্ছে। প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির জন্য ভিএইচএফ ও এইচএফ কমিউনিকেশন সিস্টেম, জিপিএস ট্র্যাকিং এবং উচ্চগতির স্পিডবোট ব্যবহার করা হচ্ছে, যার মাধ্যমে সন্দেহজনক জলযান সহজে শনাক্ত করা সম্ভব।
গত দুই মাসে বিশেষ অভিযানে ৩০ জন জলদস্যু আটক করা হয়েছে এবং তাদের কাছ থেকে চারটি আগ্নেয়াস্ত্রসহ বিপুল পরিমাণ দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া দস্যুদের কবলে থাকা ৩২ জন জেলেকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কোস্টগার্ডের চট্টগ্রাম বেইস এবং বিভিন্ন স্টেশনের সমন্বয়ে দিনব্যাপী সাঁড়াশি অভিযান চালানো হয়েছে। ‘অপারেশন সুরক্ষা’ ও ‘অপারেশন প্রতিহত’-এর মাধ্যমে উপকূলীয় এলাকায় নৌ নিরাপত্তা জোরদার করা হচ্ছে।
বর্তমানে কোস্টগার্ডের জাহাজগুলোতে অত্যাধুনিক সার্ভেইল্যান্স সিস্টেম সংযুক্ত থাকায় যে কোনো হুমকি দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব। এছাড়া সমুদ্রে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে বিশেষ হেল্পলাইনের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ও উচ্চগতির স্পিডবোট ব্যবহার করে জলদস্যুদের কর্মকাণ্ড দ্রুত প্রতিহত করা সম্ভব, যা সমুদ্র নিরাপত্তা ও জেলেদের জীবন ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার জেলেরা এখন তুলনামূলকভাবে নিরাপদে মাছ ধরা করতে পারছেন।
বঙ্গোপসাগরে এই ধরনের আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি কার্যক্রম দেশীয় জেলেদের জন্য আশ্বাসবাণী হিসেবে ধরা হচ্ছে। কোস্টগার্ডের অভিযান এবং প্রযুক্তির ব্যবহার সমুদ্র নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
কসমিক ডেস্ক