চীন ২০৩০ সালের মধ্যে চাঁদে মানুষ পাঠানোর উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য বাস্তবায়নের পথে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ অতিক্রম করতে যাচ্ছে। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে বেইজিং এবার এক বছরের জন্য একজন নভোচারীকে মহাকাশে পাঠাচ্ছে, যা দেশটির মহাকাশ গবেষণায় দীর্ঘমেয়াদি মানব উপস্থিতির ক্ষেত্রে একটি নতুন মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রবিবার (২৪ মে) রাত ১১টা ০৮ মিনিটে উত্তর-পশ্চিম চীনের জিউকুয়ান স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ কেন্দ্র থেকে ‘লং মার্চ-২এফ ওয়াই২৩’ রকেটের মাধ্যমে ‘শেনঝৌ-২৩’ মহাকাশযানটি উৎক্ষেপণ করা হবে। এই অভিযানে তিন সদস্যের একটি দল অংশ নিচ্ছে, যাদের মধ্যে একজন প্রথমবারের মতো হংকংয়ের প্রতিনিধি হিসেবে মহাকাশে যাচ্ছেন।
এই মিশনের পেলোড স্পেশালিস্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন লি জিয়াইং, যিনি আগে হংকংয়ে পুলিশ পরিদর্শক হিসেবে কাজ করতেন। তার সঙ্গে রয়েছেন কমান্ডার ঝু ইয়াংঝু এবং পাইলট ঝাং ইউয়ানঝি। এই দুইজনই চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির সদস্য।
চীনের এই মহাকাশ মিশনের বিশেষ দিক হলো, দলের একজন সদস্য টানা এক বছর তিয়াংগং মহাকাশ স্টেশনে অবস্থান করবেন। এই দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান মূলত ভবিষ্যতে চাঁদে দীর্ঘ সময় বসবাসের প্রস্তুতি হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে। বিজ্ঞানীরা এই সময়ে মানবদেহ ও মনের ওপর মহাকাশ পরিবেশের প্রভাব নিয়ে গবেষণা করবেন।
গবেষণার বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে মহাকাশে দীর্ঘ সময় থাকার কারণে শারীরিক পরিবর্তন, যেমন হাড়ের ঘনত্ব কমে যাওয়া, বিকিরণের প্রভাব, মানসিক চাপ এবং ঘুমের ধরণে পরিবর্তন। এসব তথ্য ভবিষ্যতে চাঁদ বা মঙ্গল অভিযানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
চীনের এই মিশন এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন মহাকাশ গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে প্রতিযোগিতা তীব্র আকার ধারণ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ সংস্থা নাসা ২০২৮ সালের মধ্যে চাঁদে মানুষ পাঠানোর পরিকল্পনা করেছে, যা চীনের নির্ধারিত সময়সীমার দুই বছর আগে।
অন্যদিকে চীন ২০৩০ সালের মধ্যে নিজস্ব প্রযুক্তিতে চাঁদে মানব অবতরণের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। এই লক্ষ্যে নতুন রকেট প্রযুক্তি, মহাকাশযান এবং সহায়ক অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ চলছে। পাশাপাশি ২০৩৫ সালের মধ্যে রাশিয়ার সঙ্গে যৌথভাবে চাঁদে একটি স্থায়ী ঘাঁটি স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
শেনঝৌ-২৩ মিশনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মহাকাশে মানব জীবনের মৌলিক প্রক্রিয়া বোঝার চেষ্টা। এর অংশ হিসেবে তিয়াংগং স্টেশনে মানব স্টেম সেলের নমুনা পাঠানো হয়েছে এবং সেখানে কৃত্রিম ভ্রূণ সম্পর্কিত পরীক্ষাও চালানো হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদি মানব বসবাসের সম্ভাবনা যাচাইয়ের একটি অংশ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের গবেষণা শুধু চাঁদ বা মঙ্গল অভিযানের জন্য নয়, বরং ভবিষ্যতে মহাকাশে স্থায়ী মানব বসতির ধারণাকে বাস্তব রূপ দিতে সাহায্য করবে।
চীনের রাষ্ট্রীয় মহাকাশ কর্মসূচি ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে চলেছে এবং শেনঝৌ-২৩ সেই ধারাবাহিকতারই অংশ। দীর্ঘমেয়াদি মহাকাশ অবস্থান, মানবদেহে প্রভাব বিশ্লেষণ এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা যাচাইয়ের মাধ্যমে দেশটি তার চন্দ্রাভিযানের ভিত্তি আরও শক্তিশালী করছে।
কসমিক ডেস্ক