চীনে চান্দ্র নববর্ষের ছুটির মধ্যেই আতশবাজি বিক্রির একটি দোকানে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এই দুর্ঘটনায় পাঁচজন শিশুসহ মোট ১২ জন প্রাণ হারিয়েছেন। বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। উৎসবের আনন্দের মধ্যেই ঘটে যাওয়া এই দুর্ঘটনা স্থানীয়দের পাশাপাশি দেশজুড়ে শোকের আবহ তৈরি করেছে।
রাষ্ট্রীয় তথ্য অনুযায়ী, বুধবার বিকেলে মধ্যাঞ্চলীয় হুবেই প্রদেশ-এর জিনপু গ্রামে এই বিস্ফোরণ ঘটে। চান্দ্র নববর্ষ উপলক্ষে চীনে আতশবাজি ও পটকা ফোটানোর দীর্ঘদিনের প্রচলন রয়েছে। বিশেষ করে ছুটির সময়ে আতশবাজির দোকানগুলোতে ক্রেতাদের ভিড় বেড়ে যায়। সেই ভিড়ের মধ্যেই এই দুর্ঘটনা ঘটে বলে জানানো হয়েছে।
চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি কর্তৃপক্ষ জানায়, বিস্ফোরণের পরপরই ব্যাপক অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান শুরু করা হয়। অভিযান শেষ হওয়ার পর নিশ্চিত হওয়া যায় যে, এই ঘটনায় পাঁচজন অপ্রাপ্তবয়স্কসহ মোট ১২ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের সবার পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, নিহতদের মধ্যে একজন ছাড়া বাকি ১১ জনই আতশবাজি কিনতে আসা ক্রেতা ছিলেন। ওই একজন ব্যক্তি দোকানটির মালিক বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিস্ফোরণের সময় দোকানটির ভেতরে এবং আশপাশে একাধিক মানুষ অবস্থান করছিলেন, যার ফলে হতাহতের সংখ্যা বেড়ে যায়।
নিহতদের মধ্যে তিনজন ক্রেতা প্রায় ৭৮০ কিলোমিটার দূরের শহর চেংডু থেকে স্বজনদের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন বলে জানা গেছে। ছুটির সুযোগে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর উদ্দেশ্যে তারা জিনপু গ্রামে অবস্থান করছিলেন। তবে এই দুর্ঘটনা তাদের সেই আনন্দঘন সফরকে মর্মান্তিক পরিণতিতে রূপ দেয়।
বিস্ফোরণের প্রকৃত কারণ এখনও নিশ্চিত নয়। ঘটনার পরপরই স্থানীয় পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোনো ত্রুটি ছিল কি না, দোকানে অতিরিক্ত বা অবৈধভাবে বিস্ফোরক সামগ্রী মজুত ছিল কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো কারণ উল্লেখ করেনি।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, নিরাপত্তা ঝুঁকি ও পরিবেশ দূষণের কথা বিবেচনা করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনের কয়েকটি বড় শহরে আতশবাজি ও পটকা ব্যবহারে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। কিছু শহরে নির্দিষ্ট এলাকা ছাড়া আতশবাজি ফোটানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধও করা হয়েছে। এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে মূলত দুর্ঘটনা এড়ানো এবং বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে।
তবে গ্রামীণ এলাকায় এই নিষেধাজ্ঞা তুলনামূলকভাবে শিথিল। ফলে সেখানে এখনও আতশবাজি ফোটানো এবং বিক্রির প্রচলন বেশ জনপ্রিয়। ছুটির মৌসুমে গ্রামাঞ্চলে আতশবাজির চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এমন দোকানগুলোতে ঝুঁকিও বাড়ে। এর আগেও ছুটির সময় বিভিন্ন অঞ্চলে এ ধরনের দুর্ঘটনার নজির রয়েছে।
গত রোববার পূর্বাঞ্চলীয় জিয়াংসু প্রদেশ-এ আতশবাজির একটি দোকানে বিস্ফোরণে আট জন নিহত ও দুই জন আহত হন। সেই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই হুবেই প্রদেশের এই বিস্ফোরণ নতুন করে নিরাপত্তা প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, গ্রামীণ এলাকায় আতশবাজি সংরক্ষণ ও বিক্রির ক্ষেত্রে আরও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। নিয়মিত পরিদর্শন, নিরাপত্তা মানদণ্ড কঠোরভাবে প্রয়োগ এবং জনসচেতনতা বাড়ানো না গেলে ভবিষ্যতেও এ ধরনের প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা থেকে যায়।
চান্দ্র নববর্ষ চীনে আনন্দ ও পারিবারিক পুনর্মিলনের প্রতীক হলেও, নিরাপত্তা অবহেলার কারণে সেই উৎসব বারবার শোকের ঘটনায় রূপ নিচ্ছে। হুবেই প্রদেশের এই দুর্ঘটনা আবারও স্মরণ করিয়ে দিল—উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি নিরাপত্তার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া কতটা জরুরি।