চলতি ফেব্রুয়ারি মাসে মাত্র ২৬ দিনের ব্যবধানে দেশে আটবার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। সর্বশেষ বুধবার রাত ১০টা ৫১ মিনিটে মিয়ানমারে সৃষ্ট ৫.১ মাত্রার একটি মাঝারি ভূমিকম্পে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা কেঁপে ওঠে। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, কম্পনটির উৎপত্তিস্থল ছিল ভূপৃষ্ঠের প্রায় ১২৯ কিলোমিটার গভীরে। তাৎক্ষণিকভাবে বড় কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর না মিললেও ঘন ঘন কম্পনে জনমনে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
ফেব্রুয়ারির শুরু থেকেই ভূকম্পনের ধারাবাহিকতা দেখা যাচ্ছে। ১ ফেব্রুয়ারি সিলেটে ৩ মাত্রার মৃদু কম্পন দিয়ে শুরু হয় এ মাসের ভূকম্পন। ৩ ফেব্রুয়ারি একই দিনে তিনবার কম্পন অনুভূত হয়। এর মধ্যে সাতক্ষীরার কলারোয়ায় ৪.১ মাত্রার একটি কম্পন ছিল। পাশাপাশি মিয়ানমারে ৫.৯ ও ৫.২ মাত্রার দুটি ভূমিকম্পের প্রভাবও দেশের কিছু এলাকায় অনুভূত হয়।
এরপর ৯ ও ১০ ফেব্রুয়ারি সিলেটে আরও দুটি কম্পন রেকর্ড করা হয়। ১৯ ফেব্রুয়ারি সুনামগঞ্জের ছাতকে ৪.১ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়। সব মিলিয়ে ২৬ দিনের মধ্যে আটবার কেঁপেছে দেশ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ছোট ও মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পের ঘনঘটা কখনো কখনো বড় ভূমিকম্পের পূর্বলক্ষণ হতে পারে। ভূতত্ত্ববিদ সৈয়দ হুমায়ুন আখতার সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ভূত্বকের নিচে দীর্ঘদিন ধরে শক্তি জমা হতে থাকলে তা বড় মাত্রার ভূমিকম্পের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ছোট ছোট কম্পন আসলে ভূ-অভ্যন্তরের অস্থিরতার ইঙ্গিত দেয়।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে ভারতীয় ও ইউরেশীয় টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলের কাছাকাছি অবস্থিত। ফলে দেশটি প্রাকৃতিকভাবেই ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলের মধ্যে পড়ে। পার্বত্য চট্টগ্রাম, সিলেট অঞ্চল এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চল বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ।
ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রস্তুতি। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে এখনও ভূমিকম্প মোকাবিলার প্রস্তুতি মূলত উদ্ধার তৎপরতায় সীমাবদ্ধ। কিন্তু বড় দুর্যোগ এড়াতে প্রয়োজন ঝুঁকি হ্রাসমূলক পদক্ষেপ। এর মধ্যে রয়েছে বিল্ডিং কোড কঠোরভাবে অনুসরণ, পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা তৈরি এবং সেগুলোর সংস্কার বা অপসারণ।
ঢাকা শহরের ঘনবসতি ও অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণ ভূমিকম্পের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলেছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। অনেক ভবনই নির্মাণ বিধিমালা না মেনে গড়ে উঠেছে, যা বড় ভূমিকম্পে ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির কারণ হতে পারে।
সৈয়দ হুমায়ুন আখতার বলেন, সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি কমাতে নাগরিক সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। নিয়মিত মহড়া, স্কুল-কলেজ ও অফিসে ভূমিকম্পকালীন করণীয় সম্পর্কে প্রশিক্ষণ, এবং ভূমিকম্প-সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণের বিকল্প নেই।
তিনি সতর্ক করে বলেন, ভূমিকম্প কখন ঘটবে তা নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়। তবে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের প্রস্তুত থাকা উচিত। ছোট কম্পনকে অবহেলা না করে এটিকে সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা উচিত।
সার্বিকভাবে, ফেব্রুয়ারিতে ধারাবাহিক আটটি ভূমিকম্প দেশের জন্য একটি সতর্ক সংকেত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তা বড় দুর্যোগের পূর্বাভাস কি না—এ প্রশ্নের নিশ্চিত উত্তর না মিললেও বিশেষজ্ঞরা প্রস্তুতি জোরদার করার ওপর জোর দিয়েছেন। কারণ, ভূমিকম্প প্রতিরোধ করা না গেলেও প্রস্তুতির মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
কসমিক ডেস্ক