বাংলাদেশ–মায়ানমার সীমান্তজুড়ে স্থলমাইনের আতঙ্ক দিন দিন ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। সীমান্ত এলাকায় একের পর এক মাইন বিস্ফোরণে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর হতাহতের ঘটনা ঘটছে। সর্বশেষ তথ্যে জানা গেছে, গত তিন বছরে অন্তত ২৭ জন মানুষ স্থলমাইনের বিস্ফোরণে অঙ্গহানি করেছেন। এ ছাড়া মাইন বিস্ফোরণে এক পা হারিয়েছেন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)–এর সদস্য আকতার হোসেন। প্রাণ হারিয়েছে বা গুরুতর আহত হয়েছে ৮ থেকে ১০টি বন্যহাতিও।
কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়া এবং বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি, আলীকদম ও থানচি—এই পাঁচটি উপজেলার সঙ্গে মায়ানমারের প্রায় ২৭০ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বান্দরবানের প্রায় ২২০ কিলোমিটার পাহাড়ি সীমান্ত এলাকাকে মাইন ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে ধরা হলেও সম্প্রতি নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়েছে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের নাফ নদী তীরবর্তী প্রায় ৫০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে।
সীমান্তের ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’ বা জিরো পয়েন্ট এলাকা এখন আর নিরাপদ নয়। এমনকি দেশের অভ্যন্তরেও মাইন বিস্ফোরণের ঘটনায় টেকনাফ সীমান্তবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
স্থলমাইন বিস্ফোরণের সর্বশেষ ঘটনাটি ঘটে সোমবার (১২ জানুয়ারি) সকালে টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং ইউনিয়নের লম্বাবিল এলাকায়। নাফ নদীর তীরবর্তী একটি চিংড়িঘেরে বিস্ফোরিত মাইনের ঘটনায় গুরুতর আহত হন মোহাম্মদ হানিফ নামের এক যুবক। বিস্ফোরণে তার একটি পা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সক্রিয় বিদ্রোহী সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মি (এএ) এসব স্থলমাইন পুঁতে রেখেছে। টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহ জালাল বলেন, এতদিন মাইন বিস্ফোরণের ঘটনা মূলত বান্দরবানের পাহাড়ি সীমান্ত এলাকাতেই ঘটত। টেকনাফ ও উখিয়ার নাফ নদী সীমান্তে আগে কখনো এমন ঘটনা ঘটেনি।
তিনি জানান, নাফ নদীর বুকে জেগে ওঠা বাংলাদেশের কয়েকটি চরে রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠী অবস্থান নিয়ে আরাকান আর্মির সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছিল। এসব চরে স্থানীয় বাংলাদেশিদের চিংড়িঘের রয়েছে। সম্প্রতি আরাকান আর্মি ওই রোহিঙ্গাদের সেখান থেকে তাড়িয়ে দেয়। পুনরায় যাতে তারা সেখানে আশ্রয় নিতে না পারে, সে জন্য ওই এলাকায় স্থলমাইন পুঁতে রাখা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নাইক্ষ্যংছড়ি ১১ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এস কে এম কফিল উদ্দিন কায়েস জানান, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্ত এলাকায় স্থলমাইন বিস্ফোরণে অন্তত ১৬ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত আরও অন্তত ১১ জন আহত হওয়ার তথ্য স্থানীয়ভাবে পাওয়া গেছে।
সীমান্তজুড়ে স্থলমাইনের বিস্তার রোধে দ্রুত আন্তর্জাতিক উদ্যোগ এবং সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তারা বলছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না এলে সীমান্তবাসীর জীবন ও জীবিকা চরম ঝুঁকিতে পড়বে।
কসমিক ডেস্ক