প্রায় দেড় বছর পর রাজধানীর ধানমণ্ডিতে আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ের ফটকের সামনে জাতীয় পতাকা ও বঙ্গবন্ধুর ছবি রেখে স্লোগান দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ধানমণ্ডি ৩/এ সড়কের ৫১ নম্বর বাড়ির সামনে কার্যক্রম নিষিদ্ধ যুব মহিলা লীগের ১০ থেকে ১২ জন নেত্রীকে কিছুক্ষণ অবস্থান নিতে দেখা যায়। তারা সেখানে স্লোগান দেওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যেই স্থান ত্যাগ করেন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই নেত্রীরা জাতীয় পতাকা এবং জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান-এর ছবি নিয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে অবস্থান নেন। এ সময় তারা দলীয় স্লোগান দেন। ঘটনাটি ঘিরে এলাকায় কিছুটা কৌতূহল তৈরি হলেও বড় ধরনের কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি।
ধানমণ্ডির এই ভবনটি দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয় হিসেবে পরিচিত। ২০০২ সাল থেকে ভবনটি দলীয় কার্যক্রমে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। শুরুতে এটি ভাড়ায় নেওয়া হলেও ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রক্ষমতায় এলে ভবনটি দলের নামে কিনে নেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে দলীয় কার্যক্রম সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে ২০১৪ সালে পাশের আরও দুটি ভবন কেনা হয়।
তিন তলা মূল ভবনটিতে দলীয় সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, দপ্তর সম্পাদক এবং সভাপতিমণ্ডলীর সদস্যদের জন্য আলাদা কক্ষ ছিল। দ্বিতীয় তলায় ছিল দলের মুখপত্র ‘উত্তরণ’-এর অফিস। এছাড়া তৃতীয় তলায় আওয়ামী লীগের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কার্যক্রম পরিচালিত হতো। পরে কেনা পাশের চার তলা দুটি ভবনে দলের কেন্দ্রীয় কমিটির বিষয়ভিত্তিক সম্পাদকমণ্ডলীর নেতারা এবং কেন্দ্রীয় উপকমিটির সদস্যরা বসতেন। এসব ভবনের একটিতে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন প্রকাশনা বিক্রির একটি স্টলও ছিল।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ধানমণ্ডির এই কার্যালয়সহ একাধিক দলীয় স্থাপনা হামলা ও ভাঙচুরের শিকার হয়। ওই দিন উত্তেজিত জনতা ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর সড়কের বঙ্গবন্ধু ভবনের পাশাপাশি আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়েও ভাঙচুর চালায় এবং তিনটি ভবনে আগুন লাগিয়ে দেয়। ঘটনার পর ভবনগুলো দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকে।
পরবর্তী কয়েক মাসে স্থানীয় কিছু নেশাগ্রস্ত যুবক পোড়া ভবনগুলোর ভেতরে আশ্রয় নিতে শুরু করে বলে এলাকাবাসী জানিয়েছেন। আবার কোনো কোনো সময় স্থানীয় কিছু মানুষকে ভবনগুলোর আশপাশে পাহারা দিতেও দেখা গেছে। তবে ভবনগুলোর নিয়মিত কোনো রাজনৈতিক ব্যবহার দেখা যায়নি।
অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় অন্তর্বর্তী সরকার গত বছরের মে মাসে আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনগুলোর কর্মকাণ্ডে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। সেই সিদ্ধান্তের আওতায় যুব মহিলা লীগ-এর কার্যক্রমও নিষিদ্ধ হয়। ফলে শুক্রবার সকালের এই উপস্থিতিকে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করা হয়েছে কি না—তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে।
ঘটনার বিষয়ে এখনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একইভাবে আওয়ামী লীগ বা যুব মহিলা লীগের পক্ষ থেকেও এ নিয়ে কোনো লিখিত বিবৃতি দেওয়া হয়নি। তবে ভিডিও ও ছবির মাধ্যমে ঘটনাটি দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং নানা প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নিষিদ্ধ থাকা অবস্থায় দলীয় কার্যালয়ের সামনে এ ধরনের উপস্থিতি ও স্লোগান রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। একই সঙ্গে এটি আইনগত দিক থেকেও প্রশ্নের জন্ম দিতে পারে। তবে ঘটনাটি স্বল্প সময়ের মধ্যে শেষ হওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়নি।
সব মিলিয়ে, ধানমণ্ডিতে আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ের সামনে বঙ্গবন্ধুর ছবি ও জাতীয় পতাকা রেখে স্লোগান দেওয়ার এই ঘটনাটি চলমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নতুন করে আলোচনার সৃষ্টি করেছে। নিষেধাজ্ঞা, ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং প্রশাসনিক পদক্ষেপ—সবকিছু মিলিয়ে বিষয়টি কোন দিকে গড়ায়, সে দিকেই এখন নজর সংশ্লিষ্ট মহলের।