শেখ হাসিনার সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২২টি গুরুতর কারণে কলুষিত হয়েছে বলে জানিয়েছে জাতীয় নির্বাচন তদন্ত কমিশন। নির্বাচন কারচুপি ও অনিয়মের মাত্রা দেখে তদন্ত কমিশনের সদস্যরাই বিস্মিত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি নির্বাচনের পর নির্বাচনসংক্রান্ত নথি ও তথ্য পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করা হয়েছে বলেও উঠে এসেছে তদন্তে।
সোমবার প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয় জাতীয় নির্বাচন (২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪) তদন্ত কমিশন। প্রতিবেদন গ্রহণের পর প্রধান উপদেষ্টাও বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, “আমরা ভোট ডাকাতির কথা শুনেছিলাম, কিছুটা জানতাম। কিন্তু এত নির্লজ্জভাবে পুরো প্রক্রিয়া বিকৃত করে সিস্টেম ভেঙে নিজেদের মতো করে রায় লিখে দেওয়া—এসব জাতির সামনে তুলে ধরা দরকার।”
এ সময় উপস্থিত ছিলেন কমিশনের প্রধান সাবেক বিচারপতি শামীম হাসনাইন এবং সদস্য শামীম আল মামুন, কাজী মাহফুজুল হক সুপণ, ব্যারিস্টার তাজরিয়ান আকরাম হোসেন ও ড. মো. আবদুল আলীম।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনটি নির্বাচন কলুষিত হওয়ার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে—তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল, নির্বাচনি কৌশল নির্ধারণে রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা ও সশস্ত্র বাহিনীর একটি অংশকে ব্যবহার, বিরোধী দল ও প্রার্থীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা, অজামিনযোগ্য মামলায় গ্রেপ্তার ও গুম, জাল ভোট প্রদান, আগেই ব্যালট বাক্স ভরে রাখা, ভোটারদের ভয়ভীতি দেখানো, ভোট কেন্দ্রে ভোটার প্রবেশে বাধা সৃষ্টি, সংসদীয় সীমানা অনিয়মতান্ত্রিকভাবে পুনর্নির্ধারণ এবং ভোট প্রদানের হার কৃত্রিমভাবে পরিবর্তন।
এ ছাড়া গণমাধ্যমকর্মীদের ভোটকেন্দ্রে প্রবেশে কড়াকড়ি, সরকারের আজ্ঞাবহ নির্বাচন কমিশন নিয়োগ, প্রার্থীদের ভয় দেখিয়ে বা প্রলোভনে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করানো, ডামি প্রার্থী দাঁড় করানো, নির্বাচনের পর পরিসংখ্যান প্রকাশ না করা, নির্বাচনি অভিযোগ যথাযথভাবে তদন্ত না করা এবং রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়ের কথাও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
কমিশনের সদস্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কাজী মাহফুজুল হক সুপণ বলেন, “তিনটি নির্বাচন নিয়ে যা ঘটেছে, তা দেখে আমি ব্যক্তিগতভাবে হতবাক। নির্বাচনকে ক্ষমতা দখলের হাতিয়ার বানাতে প্রশাসন থেকে শুরু করে প্রায় সব স্তরের নীতিনির্ধারককে যুক্ত করা হয়েছিল।”
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্তে বিশেষ একটি ‘নির্বাচন সেল’ গঠন করা হয়, যা প্রশাসন, পুলিশ, নির্বাচন কমিশন ও গোয়েন্দা সংস্থার একটি অংশকে সমন্বয় করে নির্বাচন নিয়ন্ত্রণ করেছে। এর ফলে ২০১৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনের পরিবর্তে প্রশাসনই কার্যত নির্বাচন পরিচালনার মূল নিয়ন্ত্রকে পরিণত হয়।
তদন্ত কমিশন জানায়, অনিয়মে কয়েক হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত থাকায় এবং সময় সীমিত হওয়ায় সবার নাম ও ভূমিকা নির্দিষ্ট করা সম্ভব হয়নি। তবে তদন্ত ও বিচারের স্বার্থে ২৩ জনের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞার সুপারিশ করা হয়।
কমিশন ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে চিহ্নিত ২০ জনের বেশি কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। এই তালিকায় রয়েছেন সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক, সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নূরুল হুদা, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক এবং একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তা। কারাগারে থাকা ব্যক্তিদেরও সেখানে গিয়ে জেরা করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনটি নির্বাচন শুধু গণতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করেনি, বরং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ওপর গভীর আঘাত হেনেছে—যার প্রভাব এখনো দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রতিফলিত হচ্ছে।
কসমিক ডেস্ক