পশ্চিমা অবরোধ, নিষেধাজ্ঞা ও আর্থিক চাপের ফলে ইরানের অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরেই সংকটাপন্ন। কিন্তু কেবল অর্থনৈতিক দুর্বলতাই ইরানের সাম্প্রতিক সরকারবিরোধী আন্দোলনের একমাত্র কারণ নয়। জানুয়ারির শুরুতে যে সহিংসতা ইরানের রাজপথে ছড়িয়ে পড়ে, তার নেপথ্যে ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সুপরিকল্পিত ‘ফল্স ফ্ল্যাগ’ অপারেশন—যেখানে বিদেশি এজেন্টদের নাগরিক বিক্ষোভকারীর ছদ্মবেশে ব্যবহার করা হয়।
ইরানের ইতিহাসে এ ধরনের হস্তক্ষেপ নতুন নয়। ১৯৫৩ সালে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেককে ক্ষমতাচ্যুত করতে ব্রিটিশ এমআই-৬ ও মার্কিন সিআইএ যে যৌথ ষড়যন্ত্র চালিয়েছিল, সেটিই মধ্যপ্রাচ্যে গণতন্ত্র ধ্বংসের প্রথম বড় নজির। ইরানের তেলসম্পদ জাতীয়করণ ছিল মোসাদ্দেকের ‘অপরাধ’। এর জবাবে বিদেশি অর্থায়নে বিক্ষোভ, সেনা অভ্যুত্থান এবং রাজতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হয়।
এই ঐতিহাসিক বিশ্বাসঘাতকতার প্রতিক্রিয়াতেই ১৯৭৯ সালে আয়াতুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে ইসলামি বিপ্লব সংঘটিত হয়। তখন থেকেই ইরানের রাষ্ট্রব্যবস্থা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের জন্য একটি কৌশলগত ‘টার্গেট’।
বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা মূলত সামরিক আগ্রাসনের চেয়ে সফট পাওয়ার, অর্থনৈতিক চাপ ও গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের ওপর বেশি নির্ভরশীল। গাজায় গণহত্যা, ইউক্রেন যুদ্ধ, ভেনিজুয়েলায় হস্তক্ষেপ কিংবা ইরানে রিজিম চেঞ্জ প্রচেষ্টা—সব ক্ষেত্রেই এই মডেল দেখা যায়।
ইরানের সাম্প্রতিক আন্দোলনের সময় মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রকাশ্য হুমকি এবং ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থার সম্পৃক্ততা তেহরানের অভিযোগকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে। ইরানের আইআরজিসি গোয়েন্দারা শত শত ছদ্মবেশী এজেন্ট গ্রেপ্তার করার পর আন্দোলন দ্রুত স্তিমিত হয়ে পড়ে—যা প্রমাণ করে এই অস্থিরতা স্বতঃস্ফূর্ত ছিল না।ইরান ও ভেনিজুয়েলার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের প্রেক্ষাপটে প্রতিবেশী ভারতের আচরণ গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। সীমান্ত বাণিজ্য, পানিবণ্টন, খাদ্য সরবরাহ ও রাজনৈতিক চাপ—সব মিলিয়ে একটি অদৃশ্য হেজিমনিক কৌশল স্পষ্ট।
ইরানের মতো বাংলাদেশও যদি অভ্যন্তরীণ বিভক্তি, দুর্বল গোয়েন্দা প্রস্তুতি ও রাজনৈতিক ঐক্যের অভাবে ভোগে, তবে ‘ফল্স ফ্ল্যাগ’ অপারেশনের ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বিদেশি এজেন্টরা সরাসরি সেনা হামলার চেয়েও বেশি বিপজ্জনক—কারণ তারা নাগরিকের ছদ্মবেশে রাষ্ট্রের ভিত কাঁপিয়ে দেয়।
চীনা সামরিক দার্শনিক সান জ্যু বহু আগেই বলেছেন—যুদ্ধ না করেই শত্রুকে পরাজিত করাই শ্রেষ্ঠ কৌশল। আজকের বিশ্ব ঠিক সেই কৌশলেই চলছে।ইরান প্রমাণ করেছে, জনগণের ঐক্য ও শক্তিশালী গোয়েন্দা কাঠামো থাকলে পরাশক্তির ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করা সম্ভব। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও জাতীয় ঐক্য, স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি এবং বিদেশি হস্তক্ষেপ মোকাবিলায় সতর্কতা ছাড়া বিকল্প নেই।
ভারতীয় আধিপত্যবাদ কিংবা পশ্চিমা সফট পাওয়ারের মুখে ২০ কোটি মানুষের ঐক্যই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি। ইরান ও ভেনিজুয়েলার অভিজ্ঞতা আমাদের নতুন করে সেই বাস্তবতাই স্মরণ করিয়ে দেয়।
কসমিক ডেস্ক