শরিকদের সঙ্গে ‘আসন সমঝোতার ভিত্তিতে’ আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে বিএনপি। তবে ধানের শীষের মনোনয়ন না পেয়ে শতাধিক আসনে বিএনপির নেতারা এখনো স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনের মাঠে থাকায় দলটির ভেতরে অস্বস্তি বাড়ছে। বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব মনে করছে, এই পরিস্থিতি ভোটের মাঠে দল ও জোটের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বিএনপির লক্ষ্য স্পষ্ট—নির্বাচনে ধানের শীষ ও জোটের প্রার্থীদের বিজয় নিশ্চিত করা। সে কারণে দলটি চায় না, বিএনপির কোনো নেতা অন্য কোনো ব্যানারে নির্বাচনের মাঠে থাকুক। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে দলীয় পর্যায় থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব পর্যন্ত বিদ্রোহী বা স্বতন্ত্র প্রার্থীদের নির্বাচন থেকে সরাতে নানা তৎপরতা শুরু হয়েছে।
এই প্রক্রিয়ার সর্বশেষ ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপে এসে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান নিজেই ‘অভিমানী’ নেতাদের সঙ্গে কথা বলছেন। বিশেষ করে যেসব আসন জোট শরিকদের জন্য ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, সেসব আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে থাকা বিএনপি নেতাদের ঢাকায় ডেকে বা সরাসরি যোগাযোগ করে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়ে ধানের শীষ বা জোট প্রার্থীর পক্ষে কাজ করার নির্দেশনা দিচ্ছেন তিনি।
দলীয় সূত্র জানায়, এসব আলোচনায় সরকার গঠন হলে ভবিষ্যতে মূল্যায়নের আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে বহিষ্কৃত নেতাদের ক্ষেত্রে বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের বিষয়েও আশ্বস্ত করা হচ্ছে। এরই মধ্যে তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা একাধিক নেতা নির্বাচন করবেন না বলে জানিয়েছেন।
বিএনপি আশা করছে, মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন ২০ জানুয়ারির আগেই বিদ্রোহী প্রার্থী ইস্যুর সুরাহা হবে। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়া নেতাদের আপাতত ‘বিদ্রোহী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও, আন্দোলন-সংগ্রামে তাদের ত্যাগ ও অবদান বিবেচনায় এখনই পুরোপুরি কঠোর না হয়ে সংযত অবস্থান নিয়েছে দলটি। তবে এটিকে বিদ্রোহীদের জন্য ‘শেষ সুযোগ’ হিসেবে দেখছে বিএনপি। ২০ জানুয়ারির পরও কেউ মাঠে থাকলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত।
এরই মধ্যে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে প্রার্থী হওয়ার অভিযোগে ১০ জনকে বহিষ্কার করেছে বিএনপি। দলটির শীর্ষ নেতারা মনে করছেন, বিদ্রোহী প্রার্থীদের নিয়ন্ত্রণে আনতে পারলে ভোটের মাঠে বিএনপি ও জোটের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে। তাই দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষা এখন বিএনপির সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
আসন্ন নির্বাচনে শরিকদের সঙ্গে বিএনপি ১৭টি আসনে সমঝোতা করেছে। ১২টি দলের সঙ্গে হওয়া এই সমঝোতায় জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ ছাড়া বাকিরা ফ্যাসিবাদবিরোধী যুগপৎ আন্দোলনের শরিক। কারও কারও ক্ষেত্রে ধানের শীষে নির্বাচন, আবার সংশোধিত আরপিও অনুযায়ী কেউ নিজ নিজ দলীয় প্রতীকে ভোট করছেন।
সমঝোতার আওতায় বগুড়া-২ আসনে নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না, ভোলা-১ আসনে বিজেপির আন্দালিব রহমান পার্থ, সিলেট-৫ আসনে জমিয়তের মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিব, নীলফামারী-১ আসনে মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী, নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে মনির হোসেন কাসেমী, যশোর-৫ আসনে রশিদ বিন ওয়াক্কাস, নড়াইল-২ আসনে ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, পটুয়াখালী-৩ আসনে নুরুল হক নুর, ঝিনাইদহ-৪ আসনে রাশেদ খান, ঢাকা-১২ আসনে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক, ঢাকা-১৩ আসনে এনডিএমের ববি হাজ্জাজ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসনে জোনায়েদ সাকি, লক্ষ্মীপুর-১ আসনে শাহাদাত হোসেন সেলিম, কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে এহসানুল হুদা, কুমিল্লা-৭ আসনে রেদোয়ান আহমদ এবং হবিগঞ্জ-১ আসনে রেজা কিবরিয়াকে আসন ছেড়েছে বিএনপি।
তবে ঢাকা-১২, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২, পটুয়াখালী-৩, ঝিনাইদহ-৪, নড়াইল-২, যশোর-৫সহ শতাধিক আসনে এখনো বিএনপির স্বতন্ত্র প্রার্থীরা মাঠে রয়েছেন। জোট নেতাদের দাবি, এসব আসনে ‘কোনো ব্যানারেই’ বিএনপির প্রার্থী থাকলে বিজয় ঝুঁকির মুখে পড়বে।
এ কারণে নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না, গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক, গণঅধিকার পরিষদের নুরুল হক নুরসহ জোট নেতারা পৃথকভাবে তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন এবং নির্বাচনী এলাকার বাস্তবতা তুলে ধরেছেন।
এরই অংশ হিসেবে গত ৮ জানুয়ারি ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে বহিষ্কৃত সাবেক সংসদ সদস্য আবদুল খালেককে ঢাকায় ডেকে কথা বলেন তারেক রহমান। তিনি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়ে জোনায়েদ সাকির পক্ষে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
একই দিন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী সৈয়দ এ কে একরামুজ্জামানের সঙ্গেও কথা বলেন বিএনপি চেয়ারম্যান। পরবর্তীতে এক ভিডিওবার্তায় একরামুজ্জামান প্রার্থিতা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন।
দলীয় সূত্র বলছে, জোটের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আসনগুলোয় থাকা স্বতন্ত্র প্রার্থীদের শিগগিরই ঢাকায় ডেকে কথা বলবেন তারেক রহমান। বিএনপির বিশ্বাস, এই উদ্যোগের মধ্য দিয়েই বিদ্রোহী প্রার্থী ইস্যুর চূড়ান্ত সমাধান হবে এবং নির্বাচনের মাঠে দলীয় ঐক্য আরও সুদৃঢ় হবে।