ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা চট্টগ্রামগামী আন্তঃনগর মহানগর প্রভাতী ট্রেনের দুটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত (এসি) কোচে চলন্ত অবস্থায় চুরির ঘটনা ঘটেছে। ট্রেনটির ছাদে স্থাপিত ‘কনডেন্সার কয়েল’ চুরি হয়ে যাওয়ায় নরসিংদী পার হওয়ার পর থেকেই সংশ্লিষ্ট দুটি কোচে এসি সম্পূর্ণভাবে বিকল হয়ে পড়ে। ফলে যাত্রীরা গন্তব্য পর্যন্ত এসি সুবিধা ছাড়াই ভ্রমণ করতে বাধ্য হন।
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, ট্রেনটি শুক্রবার সকাল পৌনে আটটার নির্ধারিত সময়ের পরিবর্তে প্রায় ১৫ মিনিট বিলম্বে ঢাকার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে ছেড়ে আসে। যাত্রার শুরুতে এসি স্বাভাবিক থাকলেও নরসিংদী অতিক্রম করার পর দুটি এসি কোচের যাত্রীরা লক্ষ্য করেন, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আর কাজ করছে না। বিষয়টি ট্রেনের দায়িত্বপ্রাপ্তদের জানানো হলেও চলন্ত অবস্থায় তাৎক্ষণিক মেরামত সম্ভব হয়নি।
পরবর্তীতে ট্রেনটি সকাল ১০টা ৫৫ মিনিটের দিকে আখাউড়া রেল জংশন-এ যাত্রাবিরতি দেয়। এখানে কারিগরি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নিশ্চিত হওয়া যায়, ট্রেনের ২৫০৫ ও ২৬০৭ নম্বর দুই এসি কোচের ছাদ থেকে কনডেন্সার কয়েল চুরি হয়েছে। এই অংশটি এসি ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; এটি না থাকলে শীতলীকরণ কার্যক্রম চালু রাখা সম্ভব নয়।
আখাউড়া রেল জংশনের বিদ্যুৎ বিভাগের সিনিয়র উপ-সহকারী প্রকৌশলী মাহবুবুল আলম জানান, ঢাকা থেকে ছেড়ে আসার পর নরসিংদী রেলওয়ে এলাকার কোনো এক সময়ে চুরির ঘটনাটি ঘটে। ফলে এসি কোচ দুটিতে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ বন্ধ হয়ে যায়। আখাউড়ায় যাত্রাবিরতির সময় ট্রেনটি ইতোমধ্যেই সময়সূচি থেকে পিছিয়ে থাকায় পূর্ণাঙ্গ এসি মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তবে নিরাপদ চলাচলের জন্য প্রয়োজনীয় মেকানিক্যাল কিছু কাজ শেষ করে ট্রেনটিকে ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
কারিগরি কাজের জন্য ট্রেনটি আখাউড়ায় প্রায় পৌনে এক ঘণ্টা থেমে থাকে। সব মিলিয়ে যাত্রাপথে বিলম্ব বেড়ে দেড় ঘণ্টার কাছাকাছি পৌঁছায়। সকাল সাড়ে ১১টার দিকে বিকল এসি নিয়েই ট্রেনটি আবার চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে। এতে করে সংশ্লিষ্ট দুটি কোচের যাত্রীরা ভোগান্তির শিকার হন, বিশেষ করে দিনের বেলায় গরমে এসি ছাড়া ভ্রমণ করা অনেকের জন্য কষ্টকর হয়ে ওঠে।
ঘটনাটি ঘিরে রেলওয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। চলন্ত ট্রেনের ছাদে থাকা গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ কীভাবে চুরি হলো—এ নিয়ে যাত্রী ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। রেলওয়ে কর্মকর্তারা বলছেন, বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে এবং দায়ীদের শনাক্তে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
রেলওয়ে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, চলন্ত ট্রেনের ছাদে ওঠা ও যন্ত্রাংশ খুলে নেওয়া সহজ কাজ নয়। এর পেছনে সংঘবদ্ধ চক্র জড়িত থাকার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আন্তঃনগর ট্রেনগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করা এবং সংবেদনশীল যন্ত্রাংশের সুরক্ষা বাড়ানো জরুরি বলে তারা মনে করছেন।
এদিকে যাত্রীরা অভিযোগ করেছেন, এসি কোচের জন্য অতিরিক্ত ভাড়া দেওয়ার পরও পরিষেবা না পাওয়ায় তারা ক্ষুব্ধ। তাদের দাবি, এ ধরনের ঘটনায় যাত্রীদের স্বার্থ রক্ষায় বিকল্প ব্যবস্থা বা ক্ষতিপূরণ নীতিমালা থাকা উচিত। একই সঙ্গে রেলওয়ের পক্ষ থেকে দ্রুত কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
সব মিলিয়ে, মহানগর প্রভাতী ট্রেনের এই ঘটনা আবারও ট্রেন নিরাপত্তা ও যাত্রীসেবার মান নিয়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। চলন্ত ট্রেন থেকে কনডেন্সার কয়েল চুরির মতো ঘটনা প্রতিরোধে নজরদারি বাড়ানো, স্টেশন ও রুটভিত্তিক নিরাপত্তা জোরদার করা এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা—এগুলো এখন সময়ের দাবি বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।