ইউরোপজুড়ে চলমান তীব্র তাপপ্রবাহের মধ্যে দক্ষিণ স্পেনের আন্দালুসিয়া অঞ্চলের আলমেরিয়া প্রদেশে ভয়াবহ দাবানলে অন্তত ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। দ্রুত ছড়িয়ে পড়া আগুনে হাজার হাজার হেক্টর বন ও পাহাড়ি এলাকা পুড়ে যাওয়ার পাশাপাশি বহু মানুষ আহত ও নিখোঁজ হয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যাপক চেষ্টা চালালেও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে আগুন এখনও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।
স্থানীয় কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার শুরু হওয়া দাবানলে এখন পর্যন্ত প্রায় ৩ হাজার ৮০০ হেক্টরেরও বেশি এলাকা পুড়ে গেছে। আগুনের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে অনেক বাসিন্দা গাড়িতে করে নিরাপদ স্থানে পালানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু আগুনের বেষ্টনীর মধ্যে আটকা পড়ে কয়েকটি গাড়ি পুড়ে যায় এবং সেখানেই অন্তত ১২ জনের মৃত্যু হয়। এছাড়া অন্তত ৮ জন আহত হয়েছেন এবং এখনও ২৩ জন নিখোঁজ রয়েছেন।
দমকল বাহিনী, উদ্ধারকারী দল ও বিমান থেকে পানি ছিটিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তবে খাড়া পাহাড়ি এলাকা, তীব্র তাপদাহ এবং প্রবল বাতাস উদ্ধার কার্যক্রমকে কঠিন করে তুলেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব কারণের সমন্বয়েই দাবানল দ্রুত বিস্তার লাভ করছে।
প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, ছিঁড়ে পড়া একটি বিদ্যুৎ লাইনের স্পার্ক থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়। গত শীত ও বসন্তে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাতের ফলে জন্ম নেওয়া ঝোপঝাড় ও ঘাস গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরমে শুকিয়ে অত্যন্ত দাহ্য অবস্থায় পৌঁছে যায়। পরে প্রবল বাতাসের কারণে আগুন দ্রুত বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।
বিশেষজ্ঞরা দাবানল নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার তিনটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন। প্রথমত, দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহের কারণে বনাঞ্চলের উদ্ভিদ সম্পূর্ণ শুকিয়ে দাহ্য পদার্থে পরিণত হয়েছে। দ্বিতীয়ত, শক্তিশালী বাতাস আগুনকে মুহূর্তেই নতুন এলাকায় ছড়িয়ে দিয়েছে। তৃতীয়ত, আলমেরিয়ার খাড়া পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি আগুন নেভানোর কাজকে অত্যন্ত কঠিন করে তুলেছে।
ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের ফায়ার সায়েন্টিস্ট গুইলারমো রেইনের ভাষ্য, এই দাবানলে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় সব উপাদান একসঙ্গে উপস্থিত ছিল। অন্যদিকে গবেষক গুস্তাভো সাইজ জানিয়েছেন, কয়েক সপ্তাহ বৃষ্টিপাত না হলে ওই অঞ্চলের উদ্ভিদ অত্যন্ত দাহ্য হয়ে ওঠে, যা দাবানলকে আরও ভয়াবহ করে তোলে।
বিশেষজ্ঞরা আরও সতর্ক করেছেন, আগুনের পাশাপাশি এর বিষাক্ত ধোঁয়াও জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, দাবানল থেকে সৃষ্ট বায়ুদূষণের কারণে প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে লাখো মানুষের অকালমৃত্যু ঘটে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও এ ধরনের দাবানল বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। একই সঙ্গে গ্রামীণ এলাকা জনশূন্য হয়ে যাওয়ায় ঝোপঝাড় পরিষ্কার না হওয়ায় বনাঞ্চলে বিপুল পরিমাণ দাহ্য উপাদান জমছে। ফলে ভবিষ্যতে ইউরোপে আরও বড় ধরনের দাবানলের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে বলে আশঙ্কা করছেন পরিবেশ ও বন বিশেষজ্ঞরা।
কসমিক ডেস্ক