চলতি শিক্ষাবর্ষের বিনামূল্যের পাঠ্যবইয়ে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের বিতর্কিত অধ্যায়গুলো যুক্ত করা হয়েছে। এতে ২০১৪ সালের ভোটারবিহীন নির্বাচন, ২০১৮ সালের ‘নাইট ইলেকশন’ এবং ২০২৪ সালের প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের সঙ্গে প্রতারণার অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে। পাঠ্যবইয়ে বলা হয়েছে, এসব নির্বাচনের মাধ্যমে তৎকালীন শেখ হাসিনার সরকার দীর্ঘমেয়াদে ক্ষমতায় থাকার পরিকল্পনা করেছিল, যা শেষ পর্যন্ত জনগণ প্রত্যাখ্যান করেছে।
গত ১ জানুয়ারি সারা দেশে শিক্ষার্থীদের হাতে এসব সংশোধিত পাঠ্যবই তুলে দেওয়া হয়। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) জানিয়েছে, তরুণ প্রজন্মকে সঠিক ইতিহাস জানাতেই পাঠ্যবইয়ে এই পরিবর্তন আনা হয়েছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের একাধিক শ্রেণির বইয়ে রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, গণআন্দোলন এবং রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
নবম ও দশম শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইয়ের দ্বিতীয় অধ্যায়ে ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা’ শিরোনামের পাঠে বলা হয়েছে, স্বাধীনতার পর জনগণের প্রত্যাশা ছিল আইনের শাসন, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার নিশ্চিত করা। তবে সেই প্রত্যাশা বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে। পাঠ্যবইয়ে উল্লেখ করা হয়, ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমান সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে একদলীয় শাসনব্যবস্থা বাকশাল প্রতিষ্ঠা করলে দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা থেমে যায়।
এ অধ্যায়ে আরও বলা হয়েছে, ২০০৮ সালে ক্ষমতায় এসে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার ধীরে ধীরে কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠে। বিরোধী রাজনৈতিক দল ও ভিন্নমতের মানুষের ওপর দমন-পীড়ন শুরু হয়। দুর্নীতির বিস্তার এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করার মাধ্যমে দলীয় কর্তৃত্ব কায়েম করা হয় বলে পাঠ্যবইয়ে উল্লেখ রয়েছে।
পাঠ্যবইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের মাধ্যমে নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে সংকট তৈরি হয়। এর পরিণতিতে ২০১৪ সালে ভোটারবিহীন নির্বাচন এবং ২০১৮ সালে নির্বাচনের আগের রাতে ব্যালট বাক্স পূর্ণ করার অভিযোগ ওঠে। এসব ঘটনাকে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে ২০২৪ সালে প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন নির্বাচনের মাধ্যমে ২০৪১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার রোডম্যাপ তৈরি করা হয়েছিল বলেও পাঠ্যবইয়ে বলা হয়।
অর্থনৈতিক প্রসঙ্গে পাঠ্যবইয়ে শেখ হাসিনার শাসনকে ফ্যাসিবাদী আখ্যা দিয়ে বলা হয়েছে, এই শাসনের ফলে দেশের অর্থনীতি ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়ে। ১৬ বছরে দুর্নীতির মাধ্যমে বছরে প্রায় ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল ও ভঙ্গুর করে দেওয়া হয়েছিল বলেও পাঠ্যবইয়ে দাবি করা হয়েছে।
জুলাই আন্দোলন নিয়েও পাঠ্যবইয়ে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, চাকরিতে কোটা সংস্কার দাবিতে ২০২৪ সালের জুনে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরু হয়। আন্দোলন দমনে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগসহ বিভিন্ন সংগঠন ও সরকারি বাহিনী নির্যাতন চালায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার পর আন্দোলন দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। ১৬ জুলাই রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদসহ কয়েকজন শিক্ষার্থী পুলিশের গুলিতে নিহত হন, যা আন্দোলনকে আরও তীব্র করে তোলে। শেষ পর্যন্ত গণআন্দোলনের মুখে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা দেশ ছাড়েন বলে পাঠ্যবইয়ে উল্লেখ রয়েছে।
এ ছাড়া ষষ্ঠ শ্রেণির চারুপাঠে কার্টুন ও ব্যঙ্গচিত্রের মাধ্যমে প্রতিবাদ ও বিদ্রোহের ভাষা তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে হেলিকপ্টার থেকে গুলি ছোড়ার প্রতীকী চিত্রও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এনসিটিবির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগের সময়ে পাঠ্যবইয়ে অতিরঞ্জিত ও অযাচিত তথ্য সংযোজন করা হয়েছিল। নতুন সংস্করণে সেসব বাদ দিয়ে বাস্তব ঘটনাপ্রবাহ তুলে ধরা হয়েছে। এনসিটিবির চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. মাহবুবুল হক পাটওয়ারী জানান, সরকারের সিদ্ধান্ত ও জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির পরামর্শে এসব পরিবর্তন আনা হয়েছে।