চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়নে এক ব্যতিক্রমী সামাজিক বাস্তবতা টিকে আছে টানা ৫৪ বছর ধরে। এই ইউনিয়নের নারীরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ভোটাধিকার প্রয়োগ করছেন না। ধর্মীয় বিশ্বাস ও সামাজিক অনুশাসনের কারণে নারী ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে যাওয়া থেকে বিরত রয়েছেন।
চাঁদপুর-৪ আসনের অন্তর্ভুক্ত ১৬ নম্বর রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়নে মোট ভোটার সংখ্যা ২১ হাজার ৬৯৫ জন। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেক নারী ভোটার হলেও বাস্তবে নির্বাচনের দিন ভোটকেন্দ্রগুলোতে নারীদের উপস্থিতি প্রায় শূন্যের কোঠায় থাকে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, ১৯৬৯ সালে ভারতের জৈনপুর থেকে আগত পীর মওদুদল হাসান কলেরা মহামারির সময় নারীদের পর্দা মানা ও ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার নির্দেশ দেন। সে সময় ওই নির্দেশ মানার ফলে মহামারি থেকে মুক্তি মিলেছিল—এমন বিশ্বাস থেকে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সব ধর্মের নারীরা আজও এই প্রথা অনুসরণ করে আসছেন।
রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়নের নারী ভোটার রুজিনা আক্তার বলেন, “আমাদের পরিবারের কোনো নারী কখনো ভোট দেয়নি। হুজুর ভোট না দিতে বলেছেন, তাই আমরা তার আদেশ মানছি। ভবিষ্যতে মানুষের মন বদলালে হয়তো নারীরা ভোট দিতেও পারে।”
ইউনিয়ন পরিষদে আসা আরেক নারী আফরোজা জানান, বাজার, মার্কেট বা সামাজিক কাজে বাইরে যেতে কোনো বাধা নেই। তবে ভোট দেওয়ার বিষয়ে এখনও ধর্মীয় ভীতি ও প্রথাগত বাধা কাজ করে।
স্থানীয় ভোটার রফিকুল ইসলাম বলেন, “এখানে স্থানীয় থেকে জাতীয় নির্বাচন—কোনোটাতেই নারীরা ভোট দেয় না। মাঝে মধ্যে কিছু দলীয় নারী নেত্রী কেন্দ্রে এলেও ভোট প্রয়োগ করেন না।”
নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বছরের পর বছর সচেতনতামূলক সভা, উঠান বৈঠক ও প্রচার চালানো হলেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি। রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মহসিন হাসান বলেন, আগের তুলনায় নারী ভোটারদের মধ্যে সচেতনতা কিছুটা বেড়েছে।
চাঁদপুর জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান খলিফা জানান, “নারী ভোটারদের কেন্দ্রমুখী করতে আমরা এখনও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। বিশেষ করে প্রার্থীদের মাধ্যমেও তাদের উদ্বুদ্ধ করার পরিকল্পনা রয়েছে।”
জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. নাজমুল ইসলাম সরকার বলেন, বিষয়টি জানার পর তিনি বিস্মিত হয়েছেন। দ্রুত ওই ইউনিয়নে গিয়ে নারীদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার আগ্রহ প্রকাশ করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, “ভোট দেওয়া নারীদের সাংবিধানিক অধিকার। এই অধিকার নিশ্চিত করতে প্রশাসন সর্বাত্মক চেষ্টা করবে।”
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে প্রশ্ন উঠেছে—দীর্ঘ ৫৪ বছরের এই সামাজিক প্রথা ভাঙা যাবে কি না। এখন সেই দিকেই তাকিয়ে স্থানীয় প্রশাসন ও নির্বাচন সংশ্লিষ্টরা।
কসমিক ডেস্ক