রাজপথের আন্দোলন, মিছিল ও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে নারীদের দৃশ্যমান উপস্থিতি থাকলেও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাদের অংশগ্রহণ এখনো আশানুরূপ নয়। নারী ও পুরুষ ভোটারের সংখ্যা প্রায় সমান হলেও আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে নারী প্রার্থীর হার এবারও খুবই সীমিত।
জুলাই সনদে সইয়ের পর ধর্মভিত্তিক তিনটি দল ছাড়া ২৭টি রাজনৈতিক দল প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তারা অন্তত ৫ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়ন দেবে এবং ধাপে ধাপে তা বাড়িয়ে ৩৩ শতাংশে নেওয়া হবে। তবে মনোনয়নপত্র দাখিল শেষে দেখা গেছে, অধিকাংশ দলই সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছে। এক-এগারোর সময় নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত ২০২০ সালের মধ্যে ৩৩ শতাংশ নারী নেতৃত্বের লক্ষ্যও রাজনৈতিক দলগুলো পূরণ করতে পারেনি।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, আসন্ন নির্বাচনে ৩০০ আসনে মোট ২ হাজার ৫৮২টি মনোনয়নপত্র জমা পড়ে। এর মধ্যে নারী প্রার্থীর সংখ্যা ছিল মাত্র ১০৭ জন, যা মোটের ৪.২৬ শতাংশ। যাচাই-বাছাই শেষে ৩৯ জন নারী প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল হয়। ফলে বর্তমানে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন ৬৮ জন নারী প্রার্থী।
৫ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হলে প্রতিটি দলের কমপক্ষে ১৫টি আসনে নারী প্রার্থী দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে মনোনয়ন পাওয়া ১০৭ নারী প্রার্থীর মধ্যে ৪০ জনই স্বতন্ত্র। দলভিত্তিক হিসাবে বিএনপি ও বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (মার্ক্সবাদী) থেকে ১০ জন করে, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল থেকে ছয়জন, ইনসানিয়াত বিপ্লব থেকে ছয়জন, জাতীয় পার্টি থেকে পাঁচজন, বাসদ থেকে পাঁচজন, গণসংহতি আন্দোলন থেকে পাঁচজন এবং অন্যান্য দল থেকে ২০ জন নারী প্রার্থী মনোনয়ন পান।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে. চৌধূরী বলেন, নারীদের ভোটার হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হলেও প্রার্থী হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা এখনো গড়ে ওঠেনি। তার মতে, নারীরা যে নির্বাচনে জয়ী হতে পারেন—এই মানসিক পরিবর্তন রাজনীতিতে আসেনি।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে উঠে আসা জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)ও মনোনয়নের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে পারেনি। জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১০ দলীয় জোটে শুধু এনসিপিই তিনজন নারী প্রার্থী দিয়েছে। এনসিপি নেত্রী মাহমুদা মিতু বলেন, দলটি ৩০টি আসনে প্রার্থী দিলেও সুযোগ পেলে আরও বেশি নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা যেত। তিনি জানান, ভবিষ্যতে সংস্কার বাস্তবায়িত হলে জোট থেকে ১০০ সংরক্ষিত নারী আসনের চিন্তা রয়েছে।
আঞ্চলিক পর্যায়েও চিত্র হতাশাজনক। চট্টগ্রামের ১৬টি আসনে ১৪৩ জন প্রার্থীর মধ্যে নারী ছিলেন মাত্র পাঁচজন। যাচাই শেষে বৈধ থাকেন তিনজন। বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি থেকে এবার চট্টগ্রামে কোনো নারী প্রার্থী নেই।
চট্টগ্রাম জেলা নির্বাচন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বৈধ নারী প্রার্থীরা হলেন—চট্টগ্রাম-১০ আসনে বাসদ (মার্ক্সবাদী) থেকে আসমা আক্তার, ইনসানিয়াত বিপ্লবের সাবিনা খাতুন এবং চট্টগ্রাম-১১ আসনে বাসদ (মার্ক্সবাদী) থেকে দীপা মজুমদার। দুই নারী প্রার্থী আপিলের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
গাজীপুর জেলায় পাঁচটি আসনে ৩২ জন পুরুষ প্রার্থীর বিপরীতে মাত্র দুই নারী প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাঁরা হলেন গাজীপুর-১ আসনে বাসদ (মার্ক্সবাদী) থেকে তসলিমা আক্তার এবং গাজীপুর-২ আসনে ইনসানিয়াত বিপ্লব থেকে সরকার তাসিলিমা আফেরাজ। আগের নির্বাচনের তুলনায় জেলায় নারী প্রার্থীর সংখ্যা অর্ধেকে নেমেছে।
গাজীপুর জেলা নির্বাচন অফিস জানায়, যাচাই শেষে মোট বৈধ প্রার্থী ৩৪ জন, যার মধ্যে নারী মাত্র দুইজন।
নারী প্রার্থীরা বলছেন, দলীয় মনোনয়ন না পাওয়া, নিরাপত্তাহীনতা এবং সাইবার বুলিংয়ের ভয় তাঁদের নির্বাচনী রাজনীতিতে পিছিয়ে দিচ্ছে। চট্টগ্রাম-১১ আসনের প্রার্থী দীপা মজুমদার বলেন, আন্দোলনে নারীদের অংশগ্রহণ থাকলেও নির্বাচনে তাঁদের সুযোগ কম।
বাংলাদেশ মহিলা সমিতির চট্টগ্রাম শাখার সাধারণ সম্পাদক জেসমিন সুলতানা পারু বলেন, নিরাপত্তা ও দলীয় সমর্থনের অভাবে অনেক নারী নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান। দলগুলো সক্রিয়ভাবে সুযোগ দিলে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ত।
গাজীপুর আদালতের সিনিয়র আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, জেলায় নারী ভোটার পুরুষের চেয়ে বেশি হলেও প্রার্থী হিসেবে নারীর সংখ্যা কমেছে। তার মতে, নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে নির্বাচনে নারীর অংশগ্রহণ আরও বাড়ানো জরুরি।