সাভার এলাকায় দীর্ঘদিন ভবঘুরে ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়ানো ‘সম্রাট’ নামে পরিচিত ব্যক্তির প্রকৃত পরিচয় উদ্ঘাটন করেছে পুলিশ। তদন্তে জানা গেছে, তার আসল নাম সবুজ শেখ। তিনি মুন্সীগঞ্জের লৌহজং থানার হলুদিয়া ইউনিয়নের মৌছামান্দ্রা গ্রামের পান্না শেখের ছেলে। পুলিশের কাছে একাধিক হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করার পর আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন।
মঙ্গলবার সকালে এসব তথ্য নিশ্চিত করেন ঢাকা জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সাভার সার্কেল) মো. আসাদুজ্জামান। তিনি জানান, সবুজ শেখ স্থানীয় এক কাউন্সিলরের নামের সঙ্গে মিল রেখে ‘সম্রাট’ পরিচয় ব্যবহার করত। গ্রেপ্তারের পর তার দেওয়া ঠিকানা ও পারিবারিক পরিচয়ের কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি।
পুলিশের তথ্যমতে, ছয়টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেপ্তার সবুজকে গত সোমবার ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে পাঠানো হয়। ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তাজুল ইসলামের আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয় সে। জবানবন্দি শেষে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সবুজ স্বীকার করেছে, শারীরিক সম্পর্কের উদ্দেশ্যে সে বিভিন্ন এলাকা থেকে ভবঘুরে নারীদের সাভার পৌর কমিউনিটি সেন্টারের পরিত্যক্ত ভবনে নিয়ে যেত। সেখানে সম্পর্ক স্থাপনের পর কোনো কারণে ক্ষুব্ধ হলে সে তাদের হত্যা করত। তবে হত্যার কারণ হিসেবে একেক সময় একেক ধরনের বক্তব্য দিয়েছে সে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান বলেন, সবুজ শেখ বিকৃত মানসিকতার ও সাইকোপ্যাথ প্রবণতার মানুষ। তার দেওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে এবং এসব হত্যাকাণ্ডে অন্য কেউ জড়িত আছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পরিবারের দাবি: মানসিকভাবে অসুস্থ
সবুজ শেখ মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার মৌছামান্দ্রা গ্রামের পান্না শেখ ও মমতাজ বেগমের দ্বিতীয় সন্তান। পরিবারের দাবি, সে মানসিকভাবে অসুস্থ। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এলাকায় সে আগে থেকেই ছিনতাই ও চুরির সঙ্গে জড়িত ছিল এবং অপরাধ করে প্রায়ই গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যেত।
সবুজের ছোট ভাই রায়হান শেখ জানান, তার ভাই একা একা কথা বলত এবং আচরণে অস্বাভাবিকতা ছিল। মা মমতাজ বেগম বলেন, কয়েক বছর ধরে তার আচরণে বড় পরিবর্তন দেখা যায় এবং পরিবারের কেউ জানত না সে কোথায় থাকে বা কী করে।
সর্বশেষ জোড়া খুনের ঘটনা
পুলিশ জানায়, সর্বশেষ ঘটনায় তানিয়া ওরফে সোনিয়া নামে এক ভবঘুরে তরুণীকে পরিত্যক্ত ভবনে নিয়ে যায় সবুজ। সেখানে আরেক ভবঘুরে যুবকের সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কের জেরে প্রথমে যুবককে এবং পরে তরুণীকে হত্যা করে। এরপর দুজনের মরদেহ একসঙ্গে রেখে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়।
সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে একজন ব্যক্তিকে মরদেহ কাঁধে নিয়ে যেতে দেখা যায়। সেই সূত্র ধরেই অভিযান চালিয়ে সবুজকে গ্রেপ্তার করা হয়। নিহত তরুণীর পরিচয় শনাক্ত হয়েছে। তার নাম তানিয়া আক্তার, যিনি রাজধানীর উত্তরা এলাকায় মায়ের সঙ্গে বসবাস করতেন এবং গত ১ জানুয়ারি থেকে নিখোঁজ ছিলেন।
আগের হত্যাকাণ্ডের যোগসূত্র
পুলিশ জানায়, গত বছরের জুলাই থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত সাভার এলাকায় একাধিক অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনার সঙ্গে সবুজের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। সর্বশেষ দুটি পোড়া মরদেহ উদ্ধারের পর তদন্তে বড় অগ্রগতি আসে।
সবুজের বিরুদ্ধে সংঘটিত প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন, নিহতদের পরিচয় নিশ্চিত এবং অন্য কেউ জড়িত আছে কিনা—সবকিছু খতিয়ে দেখছে পুলিশ। পাশাপাশি তার গ্রামের বাড়িতেও তদন্ত চালানো হচ্ছে।
কসমিক ডেস্ক