মূল্যস্ফীতি, মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং জীবনযাত্রার ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার প্রতিবাদে ইরানে শুরু হওয়া গণবিক্ষোভ দেশটির প্রায় পুরো অংশে ছড়িয়ে পড়েছে। গত ১০ দিনে এসব বিক্ষোভ ও নিরাপত্তা বাহিনীর দমন অভিযানে অন্তত ৩৬ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে চারজনের বয়স ১৮ বছরের নিচে বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি (হারানা)।
মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) প্রকাশিত হারানার প্রতিবেদনে বলা হয়, সহিংসতা, রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংস ও অস্থিরতা সৃষ্টির অভিযোগে গত ১০ দিনে সারা দেশে ২ হাজার ৭৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে ইরান সরকার এখনো হতাহত কিংবা গ্রেপ্তারের বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যান প্রকাশ করেনি।
হারানার তথ্য অনুযায়ী, ইরানের মোট ৩১টি প্রদেশের মধ্যে অন্তত ২৭টিতে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। ৯২টি শহরের ২৮৫টি স্থানে বিক্ষোভকারীরা অবস্থান নিয়ে সরকারবিরোধী স্লোগান দিচ্ছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যাপক উপস্থিতি ও কঠোর পদক্ষেপের কারণে অনেক এলাকায় সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। এসব ঘটনায় অন্তত ৬০ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
এই আন্দোলনের সূচনা হয় গত ২৮ ডিসেম্বর। সেদিন ইরানি রিয়ালের দ্রুত দরপতন এবং দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতির প্রতিবাদে রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে ব্যবসায়ীরা ধর্মঘট শুরু করেন। পরদিন ২৯ ডিসেম্বর সাধারণ মানুষ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে যোগ দিলে তা দ্রুত সরকারবিরোধী গণবিক্ষোভে রূপ নেয়।
বিক্ষোভ দমনে নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর অবস্থানের ফলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। হারানার মতে, আন্দোলনের তীব্রতা এখনো কমেনি। জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ রাজপথে অবস্থান ধরে রেখেছে এবং নতুন করে আরও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এই অভ্যন্তরীণ সংকটে আন্তর্জাতিক মাত্রাও যুক্ত হয়েছে। গত ২ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিক্ষোভকারীদের প্রতি সমর্থন জানিয়ে হুঁশিয়ারি দেন যে, ইরান সরকার যদি বিক্ষোভ দমনে নিষ্ঠুর পন্থা অবলম্বন করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারে। এই বক্তব্য ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ককে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে।
তবে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি বিদেশি চাপের কাছে নতিস্বীকার না করার ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি দেশবাসীকে সতর্ক করে বলেন, শত্রুপক্ষ পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা করছে।
অন্যদিকে দেশটির বিচারমন্ত্রী গোলাম হোসেনইন মোহসেনি বিক্ষোভকারীদের ‘দাঙ্গাবাজ’ হিসেবে অভিহিত করে আইন মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, সরকার জনগণের অভিযোগ শুনতে প্রস্তুত, তবে বিশৃঙ্খলা ও সহিংসতা কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না।
বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনৈতিক সংকট, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও রাজনৈতিক অসন্তোষ—সব মিলিয়ে ইরান এক গভীর অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যার পরিণতি নিয়ে দেশটির ভেতরে ও বাইরে উদ্বেগ বাড়ছে।
কসমিক ডেস্ক