ফ্রান্সের কট্টর ডানপন্থী নেত্রী Marine Le Pen আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন কি না, সেই বহুল আলোচিত প্রশ্নের উত্তর মিলতে পারে মঙ্গলবার। দেশটির আপিল আদালত তার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া অর্থ আত্মসাতের মামলার আপিলের রায় ঘোষণা করতে যাচ্ছে। এই রায় শুধু লে পেনের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ভবিষ্যৎই নয়, বরং ফরাসি রাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী দল National Rally-এর ভবিষ্যৎ পথচলাকেও প্রভাবিত করতে পারে।
গত বছরের মার্চে একটি নিম্ন আদালত ইউরোপীয় পার্লামেন্টের অর্থ আত্মসাতের মামলায় লে পেনকে দোষী সাব্যস্ত করেন। আদালতের রায়ে বলা হয়, ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সদস্যদের সহকারীদের বেতন বাবদ বরাদ্দকৃত অর্থ দলের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড ও কর্মীদের বেতন পরিশোধে ব্যবহার করা হয়েছে। আদালতের মতে, এই পুরো প্রক্রিয়ার মূল পরিকল্পনাকারীদের একজন ছিলেন লে পেন।
রায়ের অংশ হিসেবে তাকে পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য ঘোষণা করা হয়। পাশাপাশি এক লাখ ইউরো জরিমানা এবং চার বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এর মধ্যে দুই বছরের সাজা স্থগিত রাখা হলেও বাকি দুই বছর ইলেকট্রনিক নজরদারির আওতায় নিজ বাসভবনে কাটানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।
তবে শুরু থেকেই সব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন লে পেন। তার দাবি, তিনি কোনো ধরনের আর্থিক অনিয়ম করেননি এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই তার বিরুদ্ধে এই মামলা পরিচালিত হয়েছে। সেই কারণেই নিম্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন তিনি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আপিল আদালত যদি আগের রায় বহাল রাখে, তাহলে আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ হারাতে পারেন ৫৭ বছর বয়সী এই রাজনীতিক। এটি তার দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হবে। কারণ তিনি চতুর্থবারের মতো ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
এমন পরিস্থিতিতে ন্যাশনাল র্যালির বর্তমান সভাপতি Jordan Bardella দলের সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে সামনে চলে এসেছেন। বিভিন্ন জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, বারদেলা প্রার্থী হলেও তিনি নির্বাচনের প্রথম ধাপে শক্ত অবস্থানে থাকতে পারেন এবং চূড়ান্ত পর্বেও পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে লে পেন তার বাবা Jean-Marie Le Pen প্রতিষ্ঠিত দল ন্যাশনাল র্যালিকে নতুনভাবে গড়ে তুলেছেন। একসময় ছোট জাতীয়তাবাদী দল হিসেবে পরিচিত এই রাজনৈতিক সংগঠন বর্তমানে ফ্রান্সের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, ভবিষ্যতে দলটি সরকার গঠনেরও সক্ষমতা অর্জন করতে পারে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, আপিল আদালতের সামনে কয়েকটি সম্ভাব্য পথ খোলা রয়েছে। আদালত চাইলে নিম্ন আদালতের রায় পুরোপুরি বহাল রাখতে পারেন। আবার সাজা কমিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণের নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ দুই বছর বা তার কম করেও দিতে পারেন। সে ক্ষেত্রে আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে লে পেনের জন্য।
এ ছাড়া আদালত চাইলে আগের রায় সম্পূর্ণ বাতিলও করতে পারেন। যদিও আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, নিম্ন আদালতের রায়ের আলোকে এমন সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে কম।
যদি আপিল আদালত আগের সিদ্ধান্ত বহাল রাখেন, তাহলে লে পেন ফ্রান্সের সর্বোচ্চ আদালত Court of Cassation-এ আপিল করার সুযোগ পাবেন। তবে তিনি আগেই জানিয়েছেন, চূড়ান্ত রায় পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হলে তিনি আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নেবেন না।
বাংলাদেশ সময় মঙ্গলবার সন্ধ্যায় আদালতের রায় ঘোষণা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। একই দিন রাতে ফরাসি টেলিভিশন চ্যানেল TF1-এ একটি বিশেষ সাক্ষাৎকারেও অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে লে পেনের। সেখানে তিনি নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং আদালতের সিদ্ধান্ত নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দিতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে ন্যাশনাল র্যালি ইতোমধ্যেই লে পেনকে ছাড়া নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা বিবেচনায় প্রস্তুতি শুরু করেছে। দলটির নেতারা জানিয়েছেন, প্রয়োজনে জর্ডান বারদেলা প্রার্থী হলেও লে পেন তার নির্বাচনী প্রচারণায় সক্রিয়ভাবে অংশ নেবেন এবং দল ঐক্যবদ্ধভাবেই নির্বাচনে লড়বে।
উল্লেখ্য, এই মামলায় ইউরোপীয় পার্লামেন্টের প্রায় ৪০ লাখ ইউরোর বেশি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে, যা প্রায় ৪৬ লাখ মার্কিন ডলারের সমান। তাই আপিল আদালতের এই রায় শুধু একজন নেত্রীর রাজনৈতিক ভাগ্য নয়, ফ্রান্সের আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন এবং দেশটির রাজনৈতিক সমীকরণেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
কসমিক ডেস্ক