কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি নিয়ে বিশ্বব্যাপী আলোচিত প্রতিষ্ঠান ওপেনএআই-এর বিরুদ্ধে আবারও গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন টেসলা ও স্পেসএক্সের প্রধান ইলন মাস্ক। তার দাবি, প্রতিষ্ঠানটি মানবজাতির কল্যাণে এআই উন্নয়নের মূল লক্ষ্য থেকে সরে গিয়ে এখন একটি মুনাফালোভী করপোরেট প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।
মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের একটি ফেডারেল আদালতে চলমান মামলার শুনানিতে এ বক্তব্য দেন ইলন মাস্ক। তিনি বলেন, ওপেনএআই প্রথমে একটি দাতব্য ও মানবকল্যাণমূলক উদ্দেশ্য নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল। কিন্তু বর্তমানে এটি সেই আদর্শ থেকে সরে গিয়ে ব্যবসায়িক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, যা মানবজাতির প্রতি এক ধরনের বিশ্বাসঘাতকতা।
মাস্ক আরও দাবি করেন, যদি কোনো দাতব্য প্রতিষ্ঠান তার মূল উদ্দেশ্য থেকে সরে গিয়ে লুটপাট বা অনিয়মের দিকে যায়, তাহলে তা শুধু একটি কোম্পানির সমস্যা নয়—বরং এটি পুরো দাতব্য ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকে ধ্বংস করে দিতে পারে।
তিনি আদালতে বলেন, তিনি সাধারণত সপ্তাহে ৮০ থেকে ১০০ ঘণ্টা কাজ করেন এবং মানুষের জীবনের উন্নয়নে অবদান রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তার ভাষায়, প্রযুক্তির মাধ্যমে মানুষের জীবনমান উন্নত করাই তার মূল লক্ষ্য।
অন্যদিকে ওপেনএআই-এর আইনজীবী বিল স্যাভিট আদালতে মাস্কের বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযোগ আনেন। তিনি বলেন, মাস্ক শুরু থেকেই ওপেনএআই-কে লাভজনক কাঠামোয় রূপান্তরের পক্ষে ছিলেন এবং কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। ব্যর্থ হওয়ার পরই তিনি আলাদা এআই প্রতিষ্ঠান ‘xAI’ গড়ে তোলেন।
ওপেনএআই ও স্যাম অল্টম্যানের পক্ষের আইনজীবী আরও দাবি করেন, মাস্ক কোম্পানির প্রাথমিক অর্থায়নেও অংশ নিয়েছিলেন এবং তখন তিনি প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ থেকে লাভের সম্ভাবনা দেখেছিলেন।
আইনজীবীর বক্তব্য অনুযায়ী, মাস্ক পরে কোম্পানির সর্বোচ্চ নেতৃত্বে আসার ইচ্ছাও প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু সেই লক্ষ্য পূরণ না হওয়ায় তিনি এখন মামলার পথে গেছেন।
২০১৫ সালে ইলন মাস্ক ও স্যাম অল্টম্যানের যৌথ উদ্যোগে ওপেনএআই প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন লক্ষ্য ছিল মানবকল্যাণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরি করা। তবে পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠানটি কাঠামোগত পরিবর্তনের মাধ্যমে লাভজনক ইউনিট গঠন করে, যাতে উন্নত প্রযুক্তি প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা যায়।
বর্তমানে ওপেনএআই-এর বাজারমূল্য ৮৫০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি এখন মাইক্রোসফটসহ বড় প্রযুক্তি কোম্পানির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে।
মাস্ক ওপেনএআই ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ১৫০ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতিপূরণ দাবি করেছেন। পাশাপাশি তিনি চান, প্রতিষ্ঠানটি আবার অলাভজনক কাঠামোয় ফিরে যাক এবং নেতৃত্বে পরিবর্তন আনা হোক।
এই মামলা বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে বিচারাধীন এবং প্রযুক্তি বিশ্বে এটি একটি ‘মাইলফলক মামলা’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মামলার ফলাফল ভবিষ্যতের এআই শিল্পের নীতি ও কাঠামোতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
সব মিলিয়ে, ওপেনএআই বনাম ইলন মাস্কের এই দ্বন্দ্ব শুধু একটি কোম্পানির বিরোধ নয়, বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ ও নৈতিকতা নিয়ে বিশ্বজুড়ে চলমান বড় বিতর্কেরই অংশ।
কসমিক ডেস্ক