মেক্সিকোতে মাদক চক্রগুলোর অভ্যন্তরীণ সংঘাত নতুন করে সহিংসতার মাত্রা বাড়িয়েছে। সড়কে কিংবা ভবনের ভেতরে প্রায়ই মিলছে মরদেহ। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলীয় সিনালোয়া রাজ্যের কুলিয়াকান শহর এখন কার্যত এক যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।
সম্প্রতি শীর্ষ মাদক সম্রাট নেমেসিও ওসেগুয়ারা সার্ভান্তেস, যিনি ‘এল মেনচো’ নামে পরিচিত, রক্তক্ষয়ী বন্দুকযুদ্ধের পর হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যান। এই অভিযানে বিশেষ বাহিনীর ভূমিকায় প্রশংসা করেন মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লদিয়া শেনবাউম পার্দো।
তবে এক চক্রনেতার মৃত্যু মাদক জগতের ক্ষমতার ভারসাম্যে নতুন শূন্যতা তৈরি করেছে। বিবিসির প্রতিনিধি কোয়েন্টিন সমারভিলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিনালোয়া রাজ্যের কুলিয়াকান শহরে সেই শূন্যতা ঘিরেই বাড়ছে সংঘাতের আশঙ্কা।
সিনালোয়া কার্টেল বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ও দুর্ধর্ষ মাদক চক্র। গত দেড় বছর ধরে এই চক্র অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে জড়িয়ে আছে। এক নেতার ছেলের বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ ঘিরে শুরু হওয়া এই সংঘাত এখন রক্তক্ষয়ী রূপ নিয়েছে।
কুলিয়াকানের ৫৩ বছর বয়সী চিকিৎসাকর্মী হেক্টর তোরেস জানান, শহরজুড়ে আতঙ্ক বিরাজ করছে। তাঁর ভাষায়, “প্রতি মুহূর্ত আতঙ্কে কাটছে।” তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা প্রায় প্রতিদিনই গোলাগুলি বা অপহরণের ঘটনার পর ঘটনাস্থলে ছুটে যাচ্ছেন।
সম্প্রতি শহরের একটি গ্যারেজে গোলাগুলির ঘটনায় মালিককে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। রক্তাক্ত মেঝেতে পড়ে ছিল তাঁর নিথর দেহ। নিহতের স্ত্রী আহাজারি করতে করতে ঘটনাস্থলে পৌঁছান, কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ।
বিশ্লেষকদের মতে, কার্টেল নেতাদের অনুপস্থিতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। সিনালোয়া কার্টেলের প্রভাবশালী নেতা ইসমাইল এল মায়ো জাম্বাদা বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের কারাগারে বন্দী। তাঁর অনুপস্থিতিতে চক্রের অভ্যন্তরে ক্ষমতার লড়াই তীব্র হয়েছে।
সহিংসতার মাত্রা এতটাই বেড়েছে যে স্কুল, হাসপাতাল এমনকি শেষকৃত্য অনুষ্ঠানেও হামলার ঘটনা ঘটছে। গত এক বছরে জরুরি সহায়তার আবেদন ৭০ শতাংশের বেশি বেড়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
এই মাদক সাম্রাজ্যের মূল পণ্য ফেন্টানিল—একটি শক্তিশালী সিন্থেটিক ওপিওয়েড, যা যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপক প্রাণহানির জন্য দায়ী। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সিনালোয়া কার্টেলসহ কয়েকটি চক্রকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করেছেন এবং ফেন্টানিলকে ‘গণবিধ্বংসী অস্ত্র’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
মেক্সিকো সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে হাজার হাজার সেনা মোতায়েন করেছে। শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কে তল্লাশিচৌকি বসানো হয়েছে। ভারী অস্ত্রে সজ্জিত সেনা ও নৌবাহিনীর সদস্যরা নিয়মিত তল্লাশি চালাচ্ছেন।
তবে অপহরণ ও হত্যার ঘটনা থামছে না। সম্প্রতি একটি শপিং মলের সামনে এক ব্যক্তির মরদেহ পাওয়া যায়, যার শরীরে নির্যাতনের চিহ্ন ছিল। মরদেহের পাশে হুঁশিয়ারিমূলক বার্তা রেখে গেছে একটি চক্র, যেখানে তাকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলা হয়েছে।
১৬ বছর বয়সী কিশোর ইমানুয়েল আলেকজান্ডারের হত্যাকাণ্ড শহরবাসীর আতঙ্ক আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তাকে খুব কাছ থেকে গুলি করা হয়।
সব মিলিয়ে, মেক্সিকোর কিছু অঞ্চল এখন মাদক চক্রগুলোর লড়াইয়ে কার্যত যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক পরিবর্তন, চক্রনেতাদের গ্রেপ্তার বা মৃত্যু—এসবের মধ্যেও সহিংসতার চক্র ভাঙা যাচ্ছে না। নিরাপত্তা জোরদার হলেও সাধারণ মানুষের জীবন এখনো অনিশ্চয়তা ও ভয়ের মধ্যে আবদ্ধ।
কসমিক ডেস্ক