রাজধানীতে বসুন্ধরা গ্রুপের নাম ভাঙিয়ে এবং রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে ভুয়া সম্পর্ক দেখিয়ে কোটি টাকার প্রতারণার অভিযোগে জাহিদ আল হাসান (৩৫) নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ভাটারা থানা পুলিশ তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তাকে রাজধানীর খিলক্ষেত এলাকার জোয়ার সাহারা থেকে আটক করে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, জাহিদ আল হাসান নিজেকে কখনো প্রধানমন্ত্রী ও তার পরিবারের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি, আবার কখনো দেশের শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠী বসুন্ধরা গ্রুপের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দিতেন। কখনো তিনি ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ব্যক্তিগত সহকারী (পিএ), আবার কখনো নির্বাহী পরিচালক পরিচয় ব্যবহার করতেন। এমনকি নিজের নামের আগে ‘ইঞ্জিনিয়ার’ পদবি ব্যবহার করলেও তার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি নেই বলে জানিয়েছে পুলিশ।
অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতারণার উদ্দেশ্যে তিনি প্রযুক্তির সহায়তায় ফটোশপ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহার করে দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং ব্যবসায়ীদের সঙ্গে নিজের ভুয়া ছবি তৈরি করতেন। এসব ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে তিনি সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে নিজের প্রভাবশালী অবস্থানের একটি মিথ্যা ধারণা তৈরি করতেন।
এই ভুয়া পরিচয়কে ব্যবহার করেই তিনি বসুন্ধরা গ্রুপের বিভিন্ন প্রকল্পে দোকান বরাদ্দ, বালু ভরাটের কাজ এবং অন্যান্য ব্যবসায়িক সুযোগ পাইয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে একাধিক ব্যক্তির কাছ থেকে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে ‘বাজার প্রতিদিন’ প্রকল্পের অন্তত ১৫টি দোকান বরাদ্দের নামে তিনি অর্থ সংগ্রহ করেন বলে ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন।
ভুক্তভোগীদের একজন ফাইজুল হক গত ২৬ মে ভাটারা থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলার পর পুলিশ তদন্ত শুরু করে এবং তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় জাহিদকে শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে প্রতারণার নানা তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ।
ভাটারা থানার তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, জাহিদ বিভিন্ন সময়ে জাল ভিজিটিং কার্ড এবং নকল স্বাক্ষর ব্যবহার করে নিজেকে বসুন্ধরা গ্রুপের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে উপস্থাপন করতেন। এমনকি রেস্টুরেন্টে বসে ভুয়া কাগজপত্র দেখিয়ে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে টাকা নিতেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে, ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, প্রতারণার মাধ্যমে আদায়কৃত অর্থের বড় অংশ তিনি জুয়া খেলার মতো অবৈধ কাজে ব্যয় করেছেন। অনেকেই জানান, তিনি আগে সাধারণভাবে মোটরসাইকেলে চলাফেরা করলেও পরে প্রাইভেট কার ব্যবহার শুরু করেন, যা তার অর্থনৈতিক অবস্থার আকস্মিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
পুলিশ জানিয়েছে, জাহিদের ব্যবহৃত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অ্যাকাউন্ট, মোবাইল ফোন ও অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইস পরীক্ষা করে আরও তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে তার সঙ্গে আরও কেউ জড়িত আছে কি না এবং আরও ভুক্তভোগী রয়েছে কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
খিলক্ষেত থানার ওসি মোহাম্মদ মাজহারুল ইসলাম বলেন, অভিযুক্ত ব্যক্তি অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে মানুষের আস্থা অর্জন করতেন এবং ভুয়া প্রভাবশালী পরিচয় তৈরি করে বড় অঙ্কের অর্থ আত্মসাৎ করতেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মোবাসশীর রহমান জানিয়েছেন, আসামির বিরুদ্ধে আইনগত প্রক্রিয়া চলছে এবং তাকে রিমান্ডে নিয়ে আরও জিজ্ঞাসাবাদের আবেদন করা হবে।
এই ঘটনায় রাজধানীতে নতুন করে অনলাইন ও পরিচয়ভিত্তিক প্রতারণা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এআই ও ডিজিটাল প্রযুক্তি অপব্যবহার করে প্রতারণার ঘটনা বাড়ছে, যা প্রতিরোধে আরও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
কসমিক ডেস্ক