মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা এবং ইরান–সংক্রান্ত সংঘাতের প্রভাব এখন বৈশ্বিক বাণিজ্য রুটেও পড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় অনেক বাণিজ্যিক জাহাজ এখন বিকল্প পথ হিসেবে পানামা খাল ব্যবহার করছে।
পানামা খাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় চলতি বছরের অক্টোবর থেকে আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগরকে সংযুক্ত করা এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে প্রায় ৩০০টি অতিরিক্ত জাহাজ চলাচল করেছে। এই আকস্মিক বৃদ্ধিকে বৈশ্বিক শিপিং রুট পরিবর্তনের সরাসরি প্রভাব হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কর্তৃপক্ষের ফাইন্যান্স প্রধান ভিক্টর ভায়াল জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে। অর্থাৎ, নিরাপদ রুটের সন্ধানে জাহাজগুলো আপাতত পানামা খালকেই বেশি ব্যবহার করবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালির মতো ঝুঁকিপূর্ণ জলপথ এড়িয়ে চলার কারণে বিশ্বজুড়ে তেল ও পণ্য পরিবহন ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। অনেক জাহাজ এমন রুট ব্যবহার করছে, যেখানে আগে তুলনামূলক কম যাতায়াত হতো।
এই পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে বেশি চাপ পড়েছে পরিবহন খরচে। পানামা খাল পার হওয়ার জন্য জাহাজের আকার ও ধরনের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ৩ লাখ থেকে ৪ লাখ মার্কিন ডলার পর্যন্ত খরচ হয়। কিছু ক্ষেত্রে শেষ মুহূর্তে অতিরিক্ত ফি হিসেবে ৪ লাখ ২৫ হাজার ডলার পর্যন্ত দিতে হচ্ছে বলেও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
এর ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে পণ্যের পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। বিশেষ করে জ্বালানি, কাঁচামাল ও কনটেইনার শিপিং খাতে এই অতিরিক্ত খরচ সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি দপ্তর জানিয়েছে, তারা ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়াতে বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা ও আর্থিক নেটওয়ার্ক লক্ষ্য করে অভিযান চালাচ্ছে।
মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট এক বিবৃতিতে বলেন, “ইকোনমিক ফিউরি” নামে একটি অভিযানের মাধ্যমে ইরানের অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক, শ্যাডো ব্যাংকিং ব্যবস্থা, ক্রিপ্টো লেনদেন এবং তেল পরিবহন ব্যবস্থায় চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে।
তার দাবি অনুযায়ী, এসব পদক্ষেপের ফলে ইরানের তেল রপ্তানি সক্ষমতা কমে গেছে এবং দেশের মুদ্রাস্ফীতি ও মুদ্রার মান দুর্বল হয়ে পড়েছে। প্রতিদিন বড় অঙ্কের রাজস্ব ক্ষতির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান সংকট, সামুদ্রিক নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং নিষেধাজ্ঞা—সব মিলিয়ে বিশ্ব জ্বালানি ও বাণিজ্য ব্যবস্থায় একটি বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই নয়, বরং ইউরোপ, এশিয়া ও আমেরিকার বাণিজ্যিক বাজারেও পড়ছে।
সব মিলিয়ে, পানামা খালে জাহাজ চলাচল বৃদ্ধি শুধু একটি রুট পরিবর্তনের বিষয় নয়, বরং এটি বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার সরাসরি অর্থনৈতিক প্রভাব হিসেবে দেখা হচ্ছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা ও ব্যয় বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কসমিক ডেস্ক