ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে একটি নতুন কৌশলগত অংশীদারিত্ব চুক্তিকে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় হিসেবে দেখছে যুক্তরাজ্য। সোমবার এই চুক্তিকে স্বাগত জানালেও, প্রতিরক্ষা ও বাণিজ্য খাতে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কতটা গভীর হবে—তা নিয়ে এখনও অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। লন্ডন থেকে এ তথ্য জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএফপি।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার শুরু থেকেই ইইউর সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করাকে তার রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে তুলে ধরেছেন। ব্রেক্সিটের পর ইউরোপের সঙ্গে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, তা কমিয়ে আনার পক্ষে তিনি ধারাবাহিকভাবে যুক্তি দিয়ে আসছেন।
মঙ্গলবার পার্লামেন্টে দেওয়া বক্তব্যে লেবার নেতা স্টারমার বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে এই নতুন চুক্তি, মে মাসের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সঙ্গে স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তিগুলোর সঙ্গে মিলিয়ে যুক্তরাজ্যকে অতীতের বিভাজনমূলক রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে ভবিষ্যতের সুযোগ কাজে লাগাতে সহায়তা করবে।
২০২১ সালে ব্রেক্সিটের পর যুক্তরাজ্য ও ইইউর মধ্যে স্বাক্ষরিত বাণিজ্য ও সহযোগিতা চুক্তি শুল্ক আরোপ না করলেও, নানা ধরনের প্রশাসনিক ও নিয়ন্ত্রক জটিলতা সৃষ্টি করেছিল। নতুন চুক্তিতে খাদ্য ও পানীয় পণ্যের ক্ষেত্রে পশুস্বাস্থ্য সংক্রান্ত পরীক্ষা ও বিধিনিষেধ শিথিল করা হয়েছে।
ব্রিস্টল ও অ্যাস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক যৌথ গবেষণায় বলা হয়েছে, এসব শিথিলতার ফলে ইইউতে যুক্তরাজ্যের রপ্তানি ২২ শতাংশের বেশি বাড়তে পারে। একই সঙ্গে ইইউর কার্বন সীমান্ত কর থেকে অব্যাহতি পাওয়ায় যুক্তরাজ্য বছরে প্রায় ৮০০ মিলিয়ন ডলার সাশ্রয় করতে সক্ষম হবে।
শিল্প খাতও চুক্তিটিকে ইতিবাচকভাবে দেখছে। ইউকে স্টিল একে ইইউর সঙ্গে ইস্পাত বাণিজ্য ঘিরে চলমান বিরোধ কমানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে উল্লেখ করেছে। সরকারের হিসাব অনুযায়ী, ২০৪০ সালের মধ্যে এই চুক্তি থেকে প্রায় ৯ বিলিয়ন ইউরো অর্থনৈতিক সুফল মিলতে পারে, যদিও তা যুক্তরাজ্যের মোট জিডিপির তুলনায় মাত্র ০.৩ শতাংশ।
চুক্তির অংশ হিসেবে লন্ডন ও ব্রাসেলস প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদারে একমত হয়েছে। রাশিয়ার নিরাপত্তা হুমকি, সাইবার ঝুঁকি এবং ইউরোপ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক প্রত্যাহারের প্রেক্ষাপটে এ সহযোগিতাকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা গবেষণা সংস্থা আরইউসিআইয়ের বিশ্লেষক এড আর্নল্ডের মতে, এই চুক্তিতে এখনো নির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্য বা কার্যকর কর্মপরিকল্পনা নেই। তিনি বলেন, এটি মূলত ভবিষ্যতে আলোচনার অঙ্গীকার মাত্র এবং এতে যুক্তরাজ্যের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন হওয়ার প্রশ্ন নেই।
সেন্টার ফর ইউরোপীয় সংস্কারের উপ-পরিচালক ইয়ান বন্ড বলেন, প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হলো প্রতিরক্ষা শিল্পে যুক্তরাজ্য ও ইইউ কতটা গভীর সহযোগিতায় যাবে, যা এখনো স্পষ্ট নয়।
অন্যদিকে, বিরোধী কনজারভেটিভ পার্টি ও ইউরোসেপ্টিক রিফর্ম ইউকে সরকারকে ইইউর কাছে সার্বভৌমত্ব ছাড় দেওয়ার অভিযোগ করেছে। বিরোধীদলীয় নেতা কেমি ব্যাডেনোচ চুক্তিটিকে ব্যর্থতা ও বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
সমালোচনামুখর হয়েছে কিছু গণমাধ্যমও। ট্যাবলয়েড দ্য সান দাবি করেছে, এই চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাজ্য ইইউর স্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তা সংক্রান্ত নিয়ম মেনে চলতে এবং ভবিষ্যতের পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে সম্মত হয়েছে।
জাতীয় কৃষক ইউনিয়নের সভাপতি বলেছেন, পূর্ণ নিয়ন্ত্রক সমন্বয়ের ফলে নিজস্ব কৃষি ও খাদ্যনীতিতে যুক্তরাজ্যের প্রভাব সীমিত হয়ে পড়তে পারে।
মৎস্য খাতে যুক্তরাজ্য প্রত্যাশার তুলনায় বেশি ছাড় দিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বিশ্লেষকরা। ইইউকে ২০৩৮ সালের জুন পর্যন্ত ব্রিটিশ জলসীমায় প্রবেশাধিকার দেওয়া হয়েছে, যদিও এই খাতটি যুক্তরাজ্যের জিডিপির খুবই সামান্য অংশ জুড়ে রয়েছে।
শীর্ষ সম্মেলনের পরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু অমীমাংসিত রয়ে গেছে। এর মধ্যে রয়েছে ইইউর যুব চলাচল কর্মসূচি ও ইরাসমাস শিক্ষার্থী বিনিময় প্রকল্পে যুক্তরাজ্যের সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন। অন্যদিকে, লন্ডন শিল্পীদের ভিসা সহজীকরণ এবং পেশাগত যোগ্যতার পারস্পরিক স্বীকৃতির দাবি জানিয়েছে।
উভয় পক্ষ বছরে একবার দ্বিপাক্ষিক শীর্ষ সম্মেলন আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে সুইজারল্যান্ডের মতো একাধিক নির্দিষ্ট চুক্তির ভিত্তিতে ইইউ–যুক্তরাজ্য সম্পর্ক আরও বিকশিত হতে পারে।