আজ ২৫ মে—বাংলাদেশের উপকূলীয় মানুষের জন্য এক ভয়াল স্মৃতির দিন। ২০০৯ সালের এই দিনে আঘাত হানা প্রলয়ংকারী ঘূর্ণিঝড় আইলা লণ্ডভণ্ড করে দেয় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা। সাতক্ষীরা, খুলনা ও সংলগ্ন উপকূলীয় অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষ সেই ধাক্কা আজও কাটিয়ে উঠতে পারেনি।
ঘূর্ণিঝড় আইলার আঘাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও আশাশুনি, এবং খুলনার কয়রা ও দাকোপ এলাকা। ১৭ বছর পেরিয়ে গেলেও এসব অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা এখনো স্বাভাবিক হয়নি। সুপেয় পানির সংকট, টেকসই বেড়িবাঁধের অভাব, চিকিৎসা সুবিধার ঘাটতি এবং কর্মসংস্থানের সংকট—সব মিলিয়ে মানবেতর জীবন কাটছে উপকূলবাসীর।
একসময় সবুজে ভরা ছিল সাতক্ষীরার গাবুরা, পদ্মপুকুর ও প্রতাপনগর ইউনিয়ন। ধান, পাট ও নানা শাক-সবজিতে সমৃদ্ধ ছিল এই অঞ্চল। কিন্তু আইলার পর লবণাক্ততার প্রভাবে কৃষিজমি অনাবাদি হয়ে পড়ে। এখন সেখানে দেখা যায় লবণ পানির চিংড়ি ঘের আর পরিত্যক্ত জমি। ধীরে ধীরে বৃক্ষশূন্য হয়ে পড়ছে পুরো এলাকা।
স্থানীয়দের স্মৃতিতে এখনও জ্বলজ্বল করছে সেই বিভীষিকাময় দিনটি। ২০০৯ সালের ২৫ মে সকালে আবহাওয়া স্বাভাবিক থাকলেও দুপুরের পর আচমকা শুরু হয় জলোচ্ছ্বাস। ১৪ থেকে ১৫ ফুট উচ্চতার লোনাপানির ঢেউ মুহূর্তের মধ্যে ভাসিয়ে নেয় ঘরবাড়ি, ফসল, গবাদিপশু এমনকি অসংখ্য মানুষের জীবন।
অনেকেই সেই দিনে তাদের প্রিয়জন হারিয়েছেন। কেউ হারিয়েছেন সন্তান, কেউ বাবা-মা, আবার কারও পরিবারই নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। এখনও অনেকের লাশও খুঁজে পাওয়া যায়নি বলে জানান স্থানীয়রা।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, আইলার আঘাতে শুধু সাতক্ষীরাতেই ৭৩ জন নিহত হন এবং আহত হন দুই শতাধিক মানুষ। প্রায় ৫ লাখ ৯৫ হাজার মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েন। শ্যামনগর উপজেলায় একাই ক্ষতিগ্রস্ত হয় ২ লাখ ৪৩ হাজারের বেশি মানুষ। ধ্বংস হয়ে যায় ১ লাখ ৪২ হাজারের বেশি বসতঘর এবং শত শত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় স্থাপনা ও সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা।
এখনো উপকূলবাসীর সবচেয়ে বড় সমস্যা সুপেয় পানির সংকট। অধিকাংশ পুকুর ও জলাশয়ের পানি লবণাক্ত হয়ে যাওয়ায় পানীয় জলের জন্য দূর-দূরান্তে যেতে হয়। অনেক স্থানে এনজিওর স্থাপন করা পানি বিশুদ্ধকরণ ব্যবস্থা অকেজো হয়ে পড়েছে।
এছাড়া টেকসই বেড়িবাঁধের অভাবেও চরম ঝুঁকিতে রয়েছে উপকূলীয় অঞ্চল। বর্ষা মৌসুম এলেই নতুন করে আতঙ্ক শুরু হয়। নদীর জোয়ার বাড়লে অনেক পরিবারকে রাত জেগে বাঁধ পাহারা দিতে হয়।
কর্মসংস্থানের অভাবও দিন দিন প্রকট হয়ে উঠছে। কৃষি উৎপাদন কমে যাওয়ায় অনেকেই চিংড়ি ঘেরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। তবে সেখানে সবার জন্য কাজের সুযোগ নেই। ফলে জীবিকার সন্ধানে অনেক মানুষ এলাকা ছেড়ে শহরমুখী হচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, লবণাক্ততার প্রভাবে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। অপুষ্টি, পানিবাহিত রোগ, শিশুশ্রম এবং দারিদ্র্য বেড়ে গেছে এসব এলাকায়।
স্থানীয়দের দাবি, টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ, সুপেয় পানির স্থায়ী ব্যবস্থা, কৃষিখাত পুনর্বাসন এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি ছাড়া এই দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, জাইকা ও বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় কিছু এলাকায় টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ কাজ চলছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে উপকূলীয় অঞ্চল কিছুটা সুরক্ষা পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ১৭ বছর পরও ঘূর্ণিঝড় আইলার ক্ষত আজও গভীরভাবে বহন করছে উপকূলবাসী। কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।
কসমিক ডেস্ক