সরকারি হিসাবে দেশে সারের কোনো ঘাটতি নেই। গুদামে পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে, দামও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে চিত্র ভিন্ন। বোরো মৌসুমের মাঝামাঝি সময়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় কৃষকরা অভিযোগ করছেন—সরকারি দামে সার মিলছে না, কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে অতিরিক্ত দাম নেওয়া হচ্ছে।
বর্তমানে বোরো আবাদ চলছে প্রায় ৫০ লাখ হেক্টর জমিতে। এ মৌসুমে প্রায় সোয়া ২ কোটি টন চাল উৎপাদিত হয়, যা সারাবছরের খাদ্য সরবরাহের প্রধান ভিত্তি। ফলে সারের বাজারে সামান্য অস্থিরতাও খাদ্যনিরাপত্তায় প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরকার নির্ধারিত এক বস্তা ইউরিয়া সারের দাম ১ হাজার ২৫০ টাকা। কিন্তু কৃষকদের কাছ থেকে ১ হাজার ৪৫০ থেকে ১ হাজার ৪৬০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ। ডিএপি, টিএসপি ও এমওপির ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। কেজিপ্রতি ইউরিয়ার দাম ২৭ টাকা নির্ধারিত হলেও অনেক জায়গায় ২ থেকে ৫ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে। টিএসপির নির্ধারিত ২৭ টাকার বদলে ৩ থেকে ১৩ টাকা বেশি, ডিএপির ২১ টাকার বিপরীতে ৭ থেকে ১৫ টাকা বেশি এবং এমওপির ২০ টাকার জায়গায় ৩ থেকে ৮ টাকা বেশি নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
কৃষকদের দাবি, পরিবহন ঠিকাদার ও ডিলারের একটি চক্র অবৈধভাবে সার মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে। সরকারি গুদামে সার থাকলেও খুচরা পর্যায়ে সরবরাহ কমিয়ে দিয়ে বাড়তি দাম আদায় করা হচ্ছে। একই ব্যক্তি বা তার স্বজনের নামে একাধিক ডিলারশিপ নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
এদিকে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) বলছে, গুদামে সার রাখার জায়গা পর্যন্ত নেই। আবার কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মজুত ছিল সাড়ে ৫ লাখ টন ইউরিয়া, ৩ লাখ ২১ হাজার টন টিএসপি, ৫ লাখ ৩৩ হাজার টন ডিএপি এবং ৩ লাখ ৩১ হাজার টন এমওপি। উপজেলা পর্যায়েও চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
তবে বরাদ্দ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কিছু সারের ক্ষেত্রে গত বছরের তুলনায় সরবরাহ কিছুটা কমেছে। বিশেষ করে ভরা মৌসুমে সামান্য ঘাটতিও বাজারে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দেশের বিভিন্ন জেলায় একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। চুয়াডাঙ্গায় অভিযোগ উঠেছে, হাতে গোনা কয়েকটি পরিবার সারের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। একই ব্যক্তি বিসিআইসি ও বিএডিসির ডিলারশিপ পেয়েছেন—এমন অভিযোগও রয়েছে। গাইবান্ধায় কৃষকরা বলছেন, কেজিপ্রতি ৩ থেকে ৫ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে; রসিদ চাইলে অনেক সময় সার দেওয়া হয় না। দিনাজপুরে চাহিদার তুলনায় কম বরাদ্দের অভিযোগ উঠেছে।
রাজশাহী, যশোর, খুলনা, নওগাঁ ও বগুড়াতেও একই ধরনের অতিরিক্ত দামের অভিযোগ পাওয়া গেছে। কোথাও বস্তাপ্রতি ২০০ থেকে ৪০০ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে। কয়েক কিলোমিটার ব্যবধানে দামের তারতম্যও লক্ষ্য করা গেছে।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম সতর্ক করে বলেন, উৎপাদন খরচ বাড়তে থাকলে কৃষক ধান চাষ থেকে সরে যেতে পারেন। ইতোমধ্যে অনেক কৃষক বিকল্প ফসলে ঝুঁকছেন। ধানের বাজারদর অনিশ্চিত থাকলেও উপকরণের খরচ বাড়ছে—এই প্রবণতা চলতে থাকলে খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
সারের বাড়তি দাম প্রসঙ্গে কৃষি, খাদ্য, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, প্রমাণ পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কৃষকের স্বার্থ রক্ষায় সরকার কঠোর অবস্থানে থাকবে এবং অনিয়ম সহ্য করা হবে না।
সব মিলিয়ে, কাগজে-কলমে মজুত থাকলেও মাঠে কৃষকের অভিজ্ঞতা ভিন্ন। কার্যকর নজরদারি ও সুষ্ঠু বিতরণ ব্যবস্থা নিশ্চিত না হলে সারের এই অস্থিরতা কৃষি উৎপাদন ও খাদ্যনিরাপত্তায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
কসমিক ডেস্ক