আফ্রিকার দেশ কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে ইবোলা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব। দেশটির যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ৯০৪ জন এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন এবং মারা গেছেন অন্তত ১১৯ জন। পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)।
সংস্থাটি সতর্ক করে জানিয়েছে, কঙ্গোর জন্য এই পরিস্থিতি অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হলেও আপাতত বিশ্বব্যাপী সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তুলনামূলক কম। তবে স্থানীয় পরিস্থিতির অবনতি হলে সংকট আরও ভয়াবহ হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
কঙ্গো সরকার ও আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলো ইবোলা নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চালালেও নানা কারণে তারা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে স্থানীয় জনগণের মধ্যে সরকারের প্রতি অবিশ্বাস ও ক্ষোভ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
গত সপ্তাহে দেশটির পূর্বাঞ্চলের দুটি শহরে ইবোলা চিকিৎসা কেন্দ্রে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এতে স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং চিকিৎসা কার্যক্রম ব্যাহত হয়। বহু বছর ধরে চলা বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সহিংসতা, দারিদ্র্য, বাস্তুচ্যুতি এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী দাফন পদ্ধতির ওপর সরকারি নিষেধাজ্ঞা এবং কঠোর স্বাস্থ্যবিধিও অনেক মানুষ সহজভাবে মেনে নিতে পারছে না। ফলে অনেক পরিবার রোগ গোপন করছে এবং আক্রান্তদের চিকিৎসা কেন্দ্রে নিতে অনীহা দেখাচ্ছে।
বর্তমান প্রাদুর্ভাবের কেন্দ্রস্থল ইতুরি প্রদেশ। যদিও অঞ্চলটি সরকারি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, তবুও সেখানে ইসলামিক স্টেট ও রুয়ান্ডা-সমর্থিত এম২৩সহ বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সক্রিয় উপস্থিতির কারণে চরম নিরাপত্তাহীনতা বিরাজ করছে।
সংঘাতের কারণে ইতিমধ্যেই প্রায় ১০ লাখ মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। আন্তর্জাতিক রেড ক্রস জানিয়েছে, এই বিপুলসংখ্যক বাস্তুচ্যুত মানুষের মধ্যে ইবোলা ছড়িয়ে পড়লে তা নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে যাবে।
স্বাস্থ্য খাতের সংকটও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। স্থানীয় হাসপাতাল ও সাহায্য সংস্থাগুলো জানিয়েছে, তাদের কাছে প্রয়োজনীয় সুরক্ষা সরঞ্জাম নেই বললেই চলে। স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য পর্যাপ্ত ফেস শিল্ড, বিশেষ সুরক্ষা পোশাক, টেস্টিং কিট কিংবা লাশ দাফনের জন্য বডি ব্যাগেরও তীব্র সংকট রয়েছে। অনেক জায়গায় চিকিৎসাকর্মীরা কেবল মাস্ক ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার নিয়েই কাজ চালাচ্ছেন।
পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে ভাইরাসটির ধরন। কঙ্গোতে ছড়িয়ে পড়া ‘বান্দিবুগিও’ ধরনের ইবোলা ভাইরাসের বিরুদ্ধে এখনো কোনো অনুমোদিত টিকা বা কার্যকর চিকিৎসা আবিষ্কৃত হয়নি। ফলে আক্রান্তদের চিকিৎসা ও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য বিভাগকে অনেক বেশি সতর্ক থাকতে হচ্ছে।
এদিকে পরিস্থিতি সামাল দিতে দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলে শোকসভা ও ৫০ জনের বেশি মানুষের সমাবেশ নিষিদ্ধ করেছে প্রশাসন। তবে সহিংসতা ও অবিশ্বাসের পরিবেশে এসব নির্দেশনা বাস্তবায়ন করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও জরুরি সহায়তা দ্রুত বাড়ানো না হলে কঙ্গোর এই ইবোলা সংকট আরও বড় মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।
কসমিক ডেস্ক